
টিকিটের আকাশচুম্বী দাম ও ফিফার রিসেল নীতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক
বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই উন্মাদনা, গ্যালারিভর্তি দর্শক আর মাঠের তুমুল লড়াই। তবে মাঠের সেই লড়াই শুরুর আগেই মাঠের বাইরের এক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। বিশ্বকাপের টিকিটের দাম নিয়ে সমালোচনা যেন কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছে না তাদের। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থেকেই ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ বা পরিস্থিতি অনুযায়ী টিকিটের দাম পরিবর্তনের পদ্ধতি নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছিল। এবার সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে ফিফার অফিসিয়াল রিসেল প্ল্যাটফর্ম। একই ম্যাচের টিকিট কয়েক হাজার পাউন্ডে পুনরায় বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত হওয়ায় নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে সংস্থাটি।
আগামী সোমবার মেক্সিকোর বিপক্ষে শেষ ষোলোর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাঠে নামবে ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচটিকে ঘিরেই মূলত বিতর্কের সূত্রপাত। ইংল্যান্ডের সমর্থকদের কেনা টিকিটগুলোই ফিফার নিজস্ব রিসেল পোর্টালে অস্বাভাবিক এবং আকাশচুম্বী মূল্যে বিক্রির জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। বিষয়টি সাধারণ ফুটবলপ্রেমী ও সমর্থকদের সামনে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমর্থক সংগঠন। সাধারণ মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে টিকিট বিক্রি হওয়ায় অনেক সাধারণ সমর্থকের পক্ষেই মাঠে গিয়ে ম্যাচ দেখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই টিকিটের উৎস নিয়ে ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছে। তাদের মতে, আলোচিত টিকিটগুলো ইংল্যান্ড সাপোর্টার্স ট্রাভেল ক্লাবের সদস্যরা বেশ আগেই সংগ্রহ করেছিলেন। গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একটি ব্যালটের মাধ্যমে তারা এগুলো পেয়েছিলেন। এরপর গ্রুপ পর্বে ডিআর কঙ্গোকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইংল্যান্ড যখন শেষ ষোলো নিশ্চিত করে, তখন থেকেই এই ম্যাচের গুরুত্ব ও চাহিদা লুফে নেয় টিকিট কালোবাজারিরা। বুধবার থেকে বিখ্যাত আজতেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় এই ম্যাচটির টিকিট পুনরায় বিক্রির সুযোগ চালু করে ফিফা, আর তখনই টিকিটগুলোর দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
ফিফার এই বিতর্কিত রিসেল ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছে ফুটবল সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম বিবিসি-কে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটি সরাসরি ফিফার নিয়তের ওপর আঙুল তুলেছে। তারা বলেছে, ফিফা ইচ্ছে করেই এমন একটি অনলাইন এক্সচেঞ্জ বা বিনিময় ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে টিকিট অত্যন্ত বাড়তি দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। এর পেছনে ফিফার নিজস্ব আর্থিক লাভ রয়েছে। কারণ বিশ্ব ফুটবলের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা টিকিট ক্রেতা এবং বিক্রেতা—উভয় পক্ষের কাছ থেকেই ১৫ শতাংশ করে লভ্যাংশ বা ফি কেটে নিচ্ছে। ফলে টিকিটের দাম যত বাড়ছে, ফিফার পকেটে তত বেশি টাকা ঢুকছে।
সমর্থকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা এই সংগঠনটি আরও জানায়, এই বিশ্বকাপে শুরু থেকেই সমর্থকদের পকেট কাটার জন্য তারা ফিফার সমালোচনা করে আসছে। তবে তারা কেবল ফিফাকেই দায়ী করছে না। যেসব অতিমুনাফালোভী সমর্থক নিজেরা টিকিট পেয়ে তা অন্য ফুটবলপ্রেমীদের কাছে অযৌক্তিক ও অন্যায্য দামে বিক্রি করার চেষ্টা করছেন, তাদের কর্মকাণ্ডও কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি ফুটবলের মূল স্পিরিটের পরিপন্থী।
অবশ্য টিকিটের মূল্য নির্ধারণের এই কৌশল নিয়ে নিজেদের মতো করে সাফাই গেয়েছে ফিফা। এর আগে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংস্থাটি তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জানায়, ফিফার ভ্যারিয়েবল প্রাইসিং বা পরিবর্তনশীল মূল্যভিত্তিক টিকিট বিক্রয় ব্যবস্থাটি হুট করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এটি বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন খেলাধুলা ও বিনোদন খাতের আধুনিক শিল্পপ্রবণতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। স্টেডিয়ামে দর্শক উপস্থিতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখতে এবং প্রতিটি ম্যাচের ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করতেই টিকিটের দাম পরিস্থিতি অনুযায়ী সমন্বয় করা হয়। তবে ফিফার এই যুক্তি সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের ক্ষোভ কমাতে মোটেও সাহায্য করছে না, বরং সাধারণ মানুষকে মাঠ থেকে দূরে ঠেলে দেওয়ার এই বাণিজ্যিক নীতি নিয়ে সমালোচনা দিন দিন জোরালো হচ্ছে।