ড্রিবলিংয়ে রোনালদোকে টপকালেন ভোজিনিয়া: বিদায়ের ম্যাচেও কেপ ভার্দের বীরত্বগাথা

চলতি বিশ্বকাপের মঞ্চে রূপকথার এক নতুন অধ্যায় রচনা করে অবশেষে বিদায় নিল আফ্রিকার লড়াকু দল কেপ ভার্দে। টুর্নামেন্টজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের অন্যতম প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া এই দলটির স্বপ্নযাত্রার অবসান ঘটেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। নকআউট পর্বের রাউন্ড অব ৩২-এর রোমাঞ্চকর ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলের ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছে তারা। তবে ম্যাচ হারলেও ফুটবল বিশ্বের মন জয় করে নিয়েছেন কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সি অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়া।

লড়াকু এই ম্যাচে কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ আগলে রাখার পাশাপাশি একদম নিচ থেকে আক্রমণ তৈরিতে অবিশ্বাস্য ভূমিকা রাখেন এই প্রবীণ গোলরক্ষক। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের একের পর এক আক্রমণ নস্যাৎ করে দিয়ে ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান তিনি। আর্জেন্টিনার মতো তারকাখচিত দলের বিরুদ্ধে জয় তুলে নেওয়া মোটেও সহজ ছিল না। আলবিসেলেস্তেরা ম্যাচটি জিতলেও ভোজিনিয়া ও তার দলের জেদ এবং লড়াকু মনোভাব তাদের ঘাম ছুটিয়ে ছেড়েছিল। শেষ পর্যন্ত দিনেই বোর্গেসের একটি দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতী গোলের সুবাদে কোনো রকমে স্বস্তির জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা।

রোনালদোকে ছাড়িয়ে গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার চমকপ্রদ রেকর্ড

ম্যাচ শেষে ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে একটি অদ্ভুত ও ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান। চলতি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পর্তুগিজ সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর চেয়েও বেশি সফল ড্রিবলিং করার কীর্তি গড়েছেন গোলরক্ষক ভোজিনিয়া!

আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে তীব্র চাপের ম্যাচেও পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে দুটি সফল ড্রিবলিং সম্পন্ন করেন ভোজিনিয়া। অন্যদিকে, ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে পর্তুগালের অত্যন্ত কষ্টের জয়ের ম্যাচে মাঠে নেমেও কোনো সফল ড্রিবলিং করতে পারেননি সিআরসেভেন (CR7)। একজন গোলরক্ষক হয়েও নকআউট পর্বের ড্রিবলিংয়ের পরিসংখ্যানে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ডকে ছাড়িয়ে যাওয়া বিশ্ব ফুটবলে বেশ সাড়া ফেলেছে। অবশ্য পর্তুগাল রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচে শক্তিশালী স্পেনের মুখোমুখি হতে যাওয়ায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সামনে এই পরিসংখ্যান বদলে দেওয়ার এবং নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ এখনো থাকছে।

লড়াকু পারফরম্যান্স ও বীরত্বপূর্ণ বিদায়

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে বর্ধিত কলেবরে টুর্নামেন্টটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই বৃহৎ মঞ্চে জায়গা করে নেওয়া এবং বিশ্বসেরা দলগুলোর বিরুদ্ধে কেপ ভার্দের এই বুক চিতিয়ে লড়াই বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবল ভক্তের হৃদয় জয় করেছে। বিদায়বেলায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ভোজিনিয়া। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পারফরম্যান্স নিয়ে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি জানান, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে তারা যে প্রভাব ফেলতে পেরেছেন, তাতেই তারা ধন্য। দলটির ভবিষ্যৎ এখন অত্যন্ত উজ্জ্বল বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ম্যাচ পরবর্তী অফিশিয়াল সংবাদ সম্মেলনে ভোজিনিয়া বলেন:

“আমরা বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে খেলেছি। আজ আমরা মাঠের লড়াইয়ে তাদের সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়েছি এবং ম্যাচটি জেতার স্পষ্ট সুযোগ আমাদের সামনে ছিল। এই পারফরম্যান্সে আমাদের অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং গর্বিত হওয়া উচিত। অবশ্যই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ায় আমরা ভীষণ দুঃখিত, আমরা কেউই এখানে আমাদের যাত্রা থামাতে চাইনি। তবে আমি সবকিছুর জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি আমার সতীর্থ, টেকনিক্যাল টিম, ফুটবল ফেডারেশন এবং সেই সমস্ত সমর্থকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা অনেক কষ্ট করে দূর-দূরান্ত থেকে মাঠে এসে আমাদের সাহস ও সমর্থন জুগিয়েছেন।”

এদিকে চলতি বিশ্বকাপে আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে মহাদেশীয় পরাশক্তি মিশরের হাত ধরে। ইতিহাসের প্রথমবার বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে মোহাম্মদ সালাহর দেশ। ঐতিহাসিক এই অর্জনের পর মিশরীয় কোচ মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি মিশরের এই ঐতিহাসিক জয়টি ফিলিস্তিনের সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন, যা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে কেপ ভার্দে ও মিশরের মতো দলগুলোর এমন লড়াকু মানসিকতা এবারের বিশ্বকাপকে অন্য রকম এক সৌন্দর্যে রূপ দিয়েছে।

মন্তব্য করুন