ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের পোস্টার বয় নেইমার জুনিয়র। ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনা বা পিএসজির জার্সিতে তার সাফল্য আকাশচুম্বী হলেও, জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি এখনো তার কাছে অধরা। ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ফুটবল বিশ্বে এখন একটাই আলোচনা—এটিই কি হতে যাচ্ছে নেইমারের শেষ সুযোগ? গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নেইমারের বিশ্বকাপ অভিযাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বীরত্ব, ইনজুরি আর চরম নাটকীয়তার এক সংমিশ্রণ।
Table of Contents
২০১০-২০১৪: সূচনার বঞ্চনা ও ঘরের মাঠে ট্র্যাজেডি
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের সময় নেইমার ছিলেন সান্তোসের এক উদীয়মান বিস্ময়। ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের প্রবল দাবি সত্ত্বেও তৎকালীন কোচ দুঙ্গা তাকে দলে রাখেননি। নেইমারের বিশ্বকাপ আক্ষেপের শুরুটা মূলত সেখান থেকেই। এরপর ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে নেইমার ছিলেন মূল ভরসা। গ্রুপ পর্বে ক্রোয়েশিয়া ও ক্যামেরুনের বিপক্ষে গোল করে তিনি প্রত্যাশার পারদ উঁচুতে নিয়ে যান। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার হুয়ান জুনিগার মারাত্মক ফাউলে তার মেরুদণ্ডের কশেরুকা ভেঙে যায়। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে বেঁচে গেলেও নেইমারের টুর্নামেন্ট সেখানেই শেষ হয়। তাকে ছাড়া সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ১-৭ গোলে বিধ্বস্ত হয় ব্রাজিল।
২০১৮-২০২২: সমালোচনা ও টাইব্রেকার ভাগ্য
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে নেইমার গিয়েছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হিসেবে। তবে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে তার ফাউল হওয়ার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বেলজিয়ামের কাছে ২-১ গোলে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নেয় ব্রাজিল। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে নেইমার পুনরায় ইনজুরির কবলে পড়েন প্রথম ম্যাচেই। নকআউট পর্বে ফিরে এসে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গোল করে পেলের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন তিনি। কিন্তু ব্রাজিলের রক্ষণভাগের ভুলে শেষ মুহূর্তে গোল হজম এবং পরবর্তীতে টাইব্রেকারে হার নেইমারকে মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়তে বাধ্য করে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় নেইমারের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার
নিচে নেইমারের অংশগ্রহণ করা বিশ্বকাপগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
| সাল | আয়োজক দেশ | গোল সংখ্যা | অ্যাসিস্ট | ফলাফল | প্রধান বাধা/ঘটনা |
| ২০১০ | দক্ষিণ আফ্রিকা | ০ | ০ | দলে সুযোগ পাননি | কোচ দুঙ্গার সিদ্ধান্ত |
| ২০১৪ | ব্রাজিল | ৪ | ১ | সেমিফাইনাল | মেরুদণ্ডের ইনজুরি |
| ২০১৮ | রাশিয়া | ২ | ১ | কোয়ার্টার ফাইনাল | বেলজিয়ামের কাছে হার |
| ২০২২ | কাতার | ২ | ১ | কোয়ার্টার ফাইনাল | ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হার |
| মোট | — | ৮ | ৩ | — | — |
২০২৬: প্রত্যাশা ও শেষ সুযোগের সমীকরণ
২০২৬ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায়। ততদিনে নেইমারের বয়স হবে ৩৪ বছর। ইনজুরিপ্রবণ ক্যারিয়ার এবং ফর্ম নিয়ে শঙ্কা থাকলেও ব্রাজিল ভক্তদের ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে এখনো তিনিই। কোচিং স্টাফদের মতে, অভিজ্ঞ নেইমার এখনো বড় ম্যাচে ফলাফল নির্ধারণ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের আক্ষেপ ঘুচিয়ে নেইমার কি পারবেন ২০২৬ সালে ব্রাজিলকে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ (হেক্সা) এনে দিতে? ফুটবল ইতিহাস বলে, কিংবদন্তিদের বিদায় সবসময় মসৃণ হয় না, তবে নেইমারের সামনে সুযোগ রয়েছে নিজের শেষ বিশ্বকাপটিকে সাফল্যের রঙে রাঙানোর। এটি কেবল একটি ট্রফির লড়াই নয়, বরং এক যুগের বঞ্চনা থেকে মুক্তির লড়াই।
