
ফিফার বাণিজ্যিক প্রস্তাব: বাফুফেরা পক্ষে না হাঁটলে হাতছাড়া হতে পারে ৩৭০ কোটি টাকা
বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ নিয়ন্তক সংস্থা ফিফা তাদের বিভিন্ন টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক স্বত্বে বেসরকারি বিনিয়োগ যুক্ত করার একটি বিশাল পরিকল্পনা তৈরি করেছে। তবে এই প্রস্তাবে রাজি না হলে সদস্য দেশগুলোকে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধাবঞ্চিত করার এক প্রকার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। বিশেষ করে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় দাঁড়ায় প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা। নিজের তৈরি এই মেগা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মূলত সদস্য দেশগুলোর ওপর কৌশলী কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করছেন ফিফা প্রধান।
যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে সদস্য দেশগুলোকে মোট ৫৩ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত ভোটাভুটিতে ইতিবাচক রায় পেলেই ফিফা ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাবে।
এই নতুন বাণিজ্যিক সত্তার অধীনেই পরিচালিত হবে পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় বড় টুর্নামেন্টগুলোর বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিপণন। যেখানে বিশ্ববাজারের বড় বড় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার সুযোগ রাখা হচ্ছে। ইনফান্তিনো আশ্বাস দিয়েছেন, প্রস্তাবটি পাস হলে ২০২৭ থেকে ২০৩১ চক্রে ‘ফিফা ফরওয়ার্ড’ প্রজেক্টের অনুদান ৮ মিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ২০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। উপরন্তু, প্রস্তাবের পক্ষে রায় দেওয়া প্রতিটি দেশ এককালীন আরও ২০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত অনুদান হিসেবে উপহার পাবে।
কিন্তু কোনো দেশ এই পরিকল্পনার বিপক্ষে অবস্থান নিলে কিংবা ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে গেলে, তারা কেবল নিয়মিত ১০ মিলিয়ন ডলারের তহবিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সহজ কথায়, প্রস্তাবের বিপক্ষে গেলে বাংলাদেশ বাফুফেসহ অন্যান্য ছোট ফেডারেশনগুলো অতিরিক্ত প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা পাওয়া থেকে সরাসরি বঞ্চিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে ফিফা এই অনুদান ২০৩৫-২০৩৮ চক্রে ২৪ মিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে। নতুন এই শেয়ারভিত্তিক আন্তর্জাতিক কাঠামোর মাধ্যমে ফুটবলের সর্বোচ্চ অভিভাবক সংস্থাটির লক্ষ্য অন্তত ৪.২ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য তহবিল গঠন করা।
বাংলাদেশের মতো এশিয়া, আফ্রিকা ও ওশেনিয়া অঞ্চলের ছোট ছোট ফেডারেশনগুলো মূল জাতীয় দল পরিচালনা, উন্নত একাডেমি তৈরি, তৃণমূলের লিগ অনুষ্ঠান এবং স্টেডিয়ামের অবকাঠামো উন্নয়নে ফিফার আর্থিক অনুদানের ওপর প্রায় পুরোটা নির্ভর করে। ইনফান্তিনো নিজেও এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন, ‘ফিফার এই নিয়মিত সহায়তা না থাকলে বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশে পেশাদার ফুটবল টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে পড়ত।’
তবে ফিফার এই লোভনীয় প্যাকেজ ঘিরে ফুটবল বিশ্বে এখন তীব্র বিতর্ক ও বিরোধিতার হাওয়া বইছে। ইউরোপীয় ফুটবলের প্রধান সংস্থা উয়েফা (UEFA) অত্যন্ত কড়া ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে, ফিফা অতিরিক্ত বাণিজ্যিক লাভের আশায় ফুটবলের মৌলিক ঐতিহ্য ও ‘আত্মা বিক্রি’ করে দিচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউরোপের প্রভাবশালী ফুটবল বোর্ডগুলো দ্রুত জরুরি আলোচনায় বসছে এবং দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের দাবি অনুযায়ী, ক্ষেত্রবিশেষে বিশ্বকাপ বর্জনের মতো চরম পদক্ষেপের চিন্তাভাবনাও ঘুরপাক খাচ্ছে।
প্রস্তাবনাটি নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও (FA)। এক বিজ্ঞপ্তিতে তারা প্রকাশ করেছে যে, এত বড় পরিবর্তনের আগে তাদের কিছুই জানানো হয়নি। প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নীতিগত জায়গা থেকে বিষয়টি বেশ উদ্বেগজনক। মধ্য ও উত্তর আমেরিকার ফুটবল সংস্থা ‘কনকাকাফ’ও (CONCACAF) একইভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বড় দেশগুলো অসম্মতি জানালেও এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমর্থনেই বাজি ধরছেন ইনফান্তিনো। ফিফার মোট ২১১টি সদস্য দেশের অন্তত ৫০ শতাংশের সমর্থন এবং ফিফা কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক সবুজ সংকেত পেলেই বাস্তবায়ন হবে এই আলোচিত প্রকল্প।