বিশ্বকাপের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ২০২৬ আসরে প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পর এবার ২০৩০ সালের শতবর্ষের বিশ্বকাপে ৬৪টি দল অংশগ্রহণের সম্ভাবনা যাচাই করতে একটি স্বাধীন গবেষণা সংস্থাকে দিয়ে বিস্তৃত সমীক্ষা পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংস্থাটি।
সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের হাতে আসা একটি নথিতে জানা গেছে, ৪৮ থেকে ৬৪ দলে বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ করলে টুর্নামেন্টের প্রতিযোগিতার মান, আর্থিক সম্ভাবনা, সম্প্রচারমূল্য, বাণিজ্যিক সুযোগ এবং আয়োজনের সামগ্রিক কাঠামোর ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি এই সম্প্রসারণ বাস্তবে কার্যকর ও টেকসই হবে কি না, সেটিও মূল্যায়নের আওতায় থাকবে।
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা। দীর্ঘদিন ৩২ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পর প্রথমবারের মতো দলসংখ্যা বাড়িয়ে ৪৮ করা হয়। এর ফলে গ্রুপ পর্বের বিন্যাসে পরিবর্তন আসে, ম্যাচের সংখ্যা বাড়ে এবং নকআউট পর্বেও নতুন ধাপ যুক্ত হয়। সেই পরিবর্তনের প্রথম সংস্করণ শেষ হওয়ার পরই বিশ্বকাপকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে ফিফা।
৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের ধারণাটি নতুন নয়। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব তোলে। তাদের যুক্তি ছিল, ২০৩০ সালে বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে আরও বেশি দেশকে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। তাদের মতে, এতে ফুটবলের বৈশ্বিক বিস্তার আরও শক্তিশালী হবে এবং নতুন নতুন দেশের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে না। দলসংখ্যা বাড়লে ম্যাচের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক ফুটবল সূচির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের বিশ্রামের সময় কমে যাওয়ার আশঙ্কা, আয়োজক দেশগুলোর অবকাঠামোগত সক্ষমতা, ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, স্টেডিয়াম পরিচালনা এবং সম্প্রচার সূচির মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। গবেষণায় এসব দিকের সম্ভাব্য প্রভাব বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
ফিফার গবেষণা-সংক্রান্ত নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাধীন সংস্থাটিকে শুধু সম্ভাব্য আর্থিক লাভের হিসাব দিলেই হবে না; বরং অতিরিক্ত বাণিজ্যিক মূল্য দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কি না এবং সম্প্রসারণের সুফল সম্ভাব্য ঝুঁকির তুলনায় বেশি হবে কি না, সে বিষয়েও সুস্পষ্ট মূল্যায়ন দিতে হবে।
বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্ব পাবে কয়েকটি প্রশ্ন। যেমন—৬৪ দলের বিশ্বকাপ কি প্রতিযোগিতার মান ধরে রাখতে পারবে, নাকি শক্তিশালী ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলের ব্যবধান আরও বাড়বে? আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে অতিরিক্ত ম্যাচ সংযোজন কতটা বাস্তবসম্মত হবে? আয়োজকদের ওপর আর্থিক ও পরিচালনাগত চাপ কতটা বাড়বে? একই সঙ্গে বিশ্বকাপের বাজারমূল্য, দর্শক আগ্রহ এবং সম্প্রচারস্বত্ব থেকে সম্ভাব্য আয় কতটা বৃদ্ধি পেতে পারে, সেটিও মূল্যায়নের অংশ হবে।
ফিফা জানিয়েছে, গবেষণার দায়িত্ব কোন স্বাধীন সংস্থা পাবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে আগামী ১৪ আগস্ট। নির্বাচিত সংস্থাকে মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিফার কাছে জমা দিতে হবে। ওই প্রতিবেদনের ফলাফল ভবিষ্যতে ২০৩০ বিশ্বকাপে ৬৪ দল অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ফিফার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রতিযোগিতার পরিধি একাধিকবার বেড়েছে। প্রতিবারই লক্ষ্য ছিল আরও বেশি দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলের বিস্তার ঘটানো। এবারও সেই ধারাবাহিকতায় নতুন সম্ভাবনা যাচাই করছে ফিফা। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিযোগিতার মান, আয়োজক সক্ষমতা, খেলোয়াড়দের স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্ব—সব দিক বিবেচনায় রেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
