
বিতর্কিত সেই রেফারি মারিয়ানির কাঁধেই ব্রাজিল-জাপান ম্যাচের বড় দায়িত্ব
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচে আজ মুখোমুখি হচ্ছে লাতিন আমেরিকার ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল এবং এশিয়ার অন্যতম সুশৃঙ্খল পরাশক্তি জাপান। টেক্সাসের হিউস্টনে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১১টায় শুরু হতে যাওয়া এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের রেফারিং প্যানেল ঘোষণা করেছে ফিফা। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার এই মরণপণ লড়াই পরিচালনার মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইতালির অভিজ্ঞ ও বহুল আলোচিত রেফারি মাউরিজিও মারিয়ানিকে। মাঠের দুই দলের তীব্র লড়াইয়ের পাশাপাশি ফুটবলপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের স্পটলাইটে থাকবেন ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এই প্রধান রেফারিও।
ফিফার অফিশিয়াল ঘোষণা অনুযায়ী, মারিয়ানির সঙ্গে সহকারী রেফারি হিসেবে মাঠের দুই প্রান্তের দায়িত্ব সামলাবেন তারই স্বদেশী দুই লাইন্সম্যান দানিয়েল বিন্দোনি এবং আলবার্তো তেগোনি। ম্যাচ পরিচালনার সুবিধার্থে চতুর্থ অফিসিয়াল হিসেবে ডাগআউটে থাকছেন সুইজারল্যান্ডের সান্দ্রো শ্যারার। এছাড়া যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি ও বিকল্প ব্যবস্থা সামাল দিতে রিজার্ভ সহকারী রেফারি হিসেবে রাখা হয়েছে স্টিফেন ডি আলমেইদাকে।
চলতি বিশ্বকাপে ইতালির একমাত্র অন-ফিল্ড রেফারি হিসেবে ম্যাচ পরিচালনার বড় কীর্তি গড়েছেন মারিয়ানি। এবারের বিশ্বমঞ্চে এর আগেও তিনি বেশ দক্ষতার সাথে ম্যাচ পরিচালনা করে নজর কেড়েছেন। গ্রুপ পর্বে সৌদি আরব বনাম উরুগুয়ে এবং কলম্বিয়া বনাম ডিআর কঙ্গোর মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর মাঠের রেফারি ছিলেন এই ইতালিয়ান। গ্রুপ পর্বের সেই ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের ওপর ভরসা রেখেই এবার নকআউটের মতো কঠিন, স্নায়ুচাপের ও সংবেদনশীল ম্যাচেও তার ওপর আস্থা ধরে রাখল বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
মারিয়ানির ক্যারিয়ার ও পেনাল্টি বিতর্কের কালো অধ্যায়
মাউরিজিও মারিয়ানির রেফারিং ক্যারিয়ার যেমন দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ, তেমনই এটি ঘিরে রয়েছে নানা নেতিবাচক আলোচনা ও সমালোচনা। বিশেষ করে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবল ও ঘরোয়া লিগে তার নেওয়া বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে ব্যাপক শোরগোল ফেলেছিল। সিরি আ এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো বড় আসরে পেনাল্টি দেওয়া কিংবা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার কিছু সিদ্ধান্ত ফুটবলার, কোচ এবং সমর্থকদের চরম ক্ষোভের কারণ হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ২০২৪ সালে, যখন ইতালিয়ান লিগ সিরি আ-তে নাপোলি এবং ইন্টার মিলানের মধ্যকার একটি ম্যাচে অত্যন্ত বিতর্কিত এক পেনাল্টি দিয়ে বসেন মারিয়ানি। সেই ভুল সিদ্ধান্তের বড় খেসারত দিতে হয়েছিল তাকে। ঘটনার জেরে ফিফা ও স্থানীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাকে সাময়িকভাবে ম্যাচ পরিচালনা থেকে নিষিদ্ধ বা নির্বাসিত করে। ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে এমন শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা যেকোনো রেফারির ক্যারিয়ারেই এক বড় কালো দাগ। শুধু তাই নয়, সর্বশেষ মৌসুমেও মাঠের খেলা চলাকালীন ভিএআরের সহায়তায় নেওয়া একটি বিতর্কিত পেনাল্টি সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
এর আগেও ২০২১ সালের আরেকটি হাইভোল্টেজ ডার্বিতে ইন্টার মিলান এবং জুভেন্টাসের মহালড়াইতে খেলা শেষের ঠিক আগমুহূর্তে জুভেন্টাসের পক্ষে এক নাটকীয় পেনাল্টির বাঁশি বাজান মারিয়ানি। সেই সিদ্ধান্তটি এতটাই একপেশে ও বিতর্কিত ছিল যে, ম্যাচ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ইন্টারের ফুটবলার ও কর্মকর্তারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। মাঠ ছাড়ার পর স্টেডিয়ামের টানেলের ভেতরে গিয়ে রেফারি মারিয়ানির পথ আটকে দাঁড়িয়ে ফুটবলাররা এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন।
পেছনের এই সব তিক্ত বিতর্ক ও সমালোচনা পাশে সরিয়ে রেখে রেফারি মারিয়ানি নিশ্চয়ই চাইবেন হিউস্টনের মাঠে নিজের অভিজ্ঞতার সেরাটা দিতে। একদিকে ব্রাজিলের নান্দনিক ছন্দময় ফুটবল আর অন্যদিকে জাপানের চেনা গতি ও লড়াকু মানসিকতা—দুইয়ে মিলে মাঠের আবহ যে প্রথম মিনিট থেকেই উত্তপ্ত থাকবে, তা নিশ্চিত। এমন এক হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে মাঠের খেলোয়াড়দের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শতভাগ নিখুঁত সিদ্ধান্ত দেওয়াই হবে মারিয়ানি ও তার রেফারিং দলের জন্য চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।