বিশ্বকাপের পর বাফুফের বার্ষিক সভা স্থগিত

দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) পূর্বনির্ধারিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আগামী ২২ মে এই সভাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ১০ মে ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির এক জরুরি অনলাইন সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের পর কোনো একটি সুবিধাজনক সময়ে এই সাধারণ সভা পুনরায় আয়োজন করা হবে।

এজিএম স্থগিত করার যৌক্তিক কারণসমূহ

বাফুফে সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যালেন্ডারের ব্যস্ততার কারণেই এই গুরুত্বপূর্ণ সভাটি পিছিয়ে দিতে হয়েছে। এর পেছনে প্রধান তিনটি কারণ উল্লেখযোগ্য:

১. অডিট রিপোর্ট বা নিরীক্ষা প্রতিবেদন সম্পন্ন না হওয়া: একটি ফেডারেশনের বার্ষিক সাধারণ সভার বৈধতা রক্ষার জন্য বিগত বছরের আর্থিক অডিট রিপোর্ট পেশ করা বাধ্যতামূলক। বাফুফের ২০২৫ সালের অডিট রিপোর্ট এখনো চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, পেশাদার নিরীক্ষক দ্বারা রিপোর্ট প্রস্তুত হওয়ার পর বাফুফের অর্থ কমিটি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নীতি-নির্ধারক কমিটি এটি পর্যালোচনা করে। এই পর্যালোচনার জন্য ন্যূনতম এক সপ্তাহ সময়ের প্রয়োজন হয়। বর্তমান সময়ের স্বল্পতার কারণে ২২ মে’র মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা দাপ্তরিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

২. ঈদুল আজহা ও প্রতিনিধিদের যাতায়াত বিড়ম্বনা: চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২৭ অথবা ২৮ মে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২২ মে সভা অনুষ্ঠিত হলে দেশের দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে আসা কাউন্সিলর ও প্রতিনিধিদের নিজ এলাকায় ফিরতে ব্যাপক ঈদযাত্রার ঝক্কি ও যানজটের সম্মুখীন হতে হতো। এছাড়া ঈদের আগের দিনগুলোতে ব্যবসায়িক ও পারিবারিক ব্যস্ততা থাকায় প্রতিনিধিদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং মনে করছে ফেডারেশন। ফলে সার্বিক জনস্বার্থ ও মানবিক দিক বিবেচনা করে সভাটি স্থগিত করা হয়েছে।

৩. আন্তর্জাতিক ফুটবল ব্যস্ততা ও কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর: জুন মাস বিশ্ব ফুটবলের জন্য একটি ব্যস্ততম সময়, কারণ এ সময় ফিফা বিশ্বকাপের আন্তর্জাতিক আসর শুরু হতে যাচ্ছে। উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ—আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য এই আসর দেখার জন্য বাফুফে এবং দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর অনেক কর্মকর্তা ইতিমধ্যে বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছেন। পাশাপাশি জুন মাসে বাংলাদেশের দুটি জাতীয় দল মালদ্বীপ ও সান মারিনোতে পৃথক দুটি টুর্নামেন্টে অংশ নেবে। গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের এই অনুপস্থিতিতে নীতিনির্ধারণী সভা সফল হবে না বলেই মনে করছে নির্বাহী কমিটি।

কাউন্সিলরদের নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম

পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজনের লক্ষ্যে বাফুফে ইতিমধ্যে তাদের অধিভুক্ত সংস্থা, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও ক্লাবগুলোর কাছে কাউন্সিলর বা প্রতিনিধির নাম চেয়ে আনুষ্ঠানিক পত্র প্রেরণ করেছিল। অনেক সংস্থা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের প্রতিনিধির নাম জমা দিয়ে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিয়েছিল। তবে বর্তমান সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে এই প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্বকাপের পর সভার নতুন তারিখ নির্ধারিত হলে পুনরায় বিধি মোতাবেক সংশ্লিষ্টদের আমন্ত্রণ জানানো হবে।

এএফসি গ্রাসরুট ডে পালন প্রসঙ্গে বিশেষ সিদ্ধান্ত

বার্ষিক সাধারণ সভা পিছিয়ে গেলেও ফুটবলের অন্যান্য প্রচারণামূলক ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে না। নির্বাহী কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, ২২ মে এজিএম না হলেও এর পরদিন অর্থাৎ ২৩ মে ‘এএফসি গ্রাসরুট ডে’ যথাযথ মর্যাদায় সারা দেশে পালন করা হবে। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) এই বিশেষ কর্মসূচিটি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে তৃণমূল পর্যায়ের শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছে বাফুফে।

বাফুফের নীতিনির্ধারকদের মতে, বিশ্বকাপের সমাপ্তির পর যখন ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং অভ্যন্তরীণ অডিট রিপোর্টসহ যাবতীয় দাপ্তরিক কাজ চূড়ান্ত হবে, তখনই একটি কার্যকর এজিএম আয়োজন করা সম্ভব হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং কাউন্সিলরদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে ফেডারেশন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর ফলে ফেডারেশনের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা যেমন সহজ হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক ব্যস্ততা শেষে সকল ক্লাব কর্মকর্তাদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিও নিশ্চিত করা যাবে।

Leave a Comment