বিশ্বকাপে দ্রুত অফসাইড সিদ্ধান্তে আসছে নতুন প্রযুক্তি

আন্তর্জাতিক ফুটবলে অফসাইড সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো খেলোয়াড় অফসাইড অবস্থানে যাওয়ার পরও সহকারী রেফারি (লাইনসম্যান) কিছু সময় অপেক্ষা করে পতাকা তোলেন, যাতে খেলার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। তবে বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবারের বিশ্বকাপে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘোষণা দেওয়ায় এই বিলম্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফিফা জানিয়েছে, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে আধা স্বয়ংক্রিয় (সেমি-অটোমেটেড) অফসাইড প্রযুক্তির উন্নত সংস্করণ চালু করা হবে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অফসাইডের সিদ্ধান্ত দ্রুত ও তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে, কোনো খেলোয়াড় যদি ১০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইডে অবস্থান করেন, তাহলে সহকারী রেফারির কাছে সঙ্গে সঙ্গে একটি অডিও সংকেত পৌঁছে যাবে, যা তাকে দ্রুত পতাকা তুলতে সহায়তা করবে।

এর আগে ক্লাব বিশ্বকাপ ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত সংস্করণে ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইড হলে তবেই সংকেত দেওয়া হতো। নতুন ব্যবস্থায় এই সীমা কমিয়ে আরও সূক্ষ্ম করা হয়েছে, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে।

প্রযুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

বৈশিষ্ট্যবিবরণ
অফসাইড শনাক্তকরণ সীমা১০ সেন্টিমিটারের বেশি
সংকেত পদ্ধতিসহকারী রেফারির জন্য অডিও অ্যালার্ট
পূর্ববর্তী সীমা৫০ সেন্টিমিটার (পরীক্ষামূলক পর্যায়ে)
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তমাঠের রেফারির হাতে
প্রযুক্তির ধরনআধা স্বয়ংক্রিয় (সেমি-অটোমেটেড)

তবে ফিফা স্পষ্ট করেছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মাঠের রেফারির হাতেই থাকবে। প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা সন্দেহ দেখা দিলে রেফারি বা সহকারী রেফারি সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে পারবেন। ভুল কমানোর লক্ষ্যে এই প্রযুক্তিতে বিভিন্ন সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি খুব সূক্ষ্ম বা গা-ঘেঁষা অফসাইড পরিস্থিতি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সব সময় সক্ষম নাও হতে পারে। পাশাপাশি, খেলোয়াড়রা যদি মাটিতে পড়ে থাকেন বা একাধিক খেলোয়াড় কাছাকাছি অবস্থানে থাকেন, সেক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। তাছাড়া, শুধুমাত্র অবস্থানভিত্তিক অফসাইড নির্ধারণ করা সম্ভব হলেও, কোনো খেলোয়াড় বল স্পর্শ না করেও প্রতিপক্ষকে প্রভাবিত করছেন কি না—এ ধরনের ব্যাখ্যামূলক সিদ্ধান্ত রেফারিকেই নিতে হবে।

নিরাপত্তা ও খেলোয়াড়দের সুরক্ষার দিক থেকেও এই প্রযুক্তির গুরুত্ব রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে নটিংহাম ফরেস্টের স্ট্রাইকার তাইও আওনিয়ি অফসাইড পতাকা তুলতে দেরি হওয়ায় গোলপোস্টে ধাক্কা খেয়ে গুরুতর আহত হয়ে কোমায় চলে যান। এমন ঘটনা ভবিষ্যতে কমাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ফিফা আরও জানিয়েছে, প্রতিটি খেলোয়াড়ের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘থ্রিডি অবতার’ তৈরি করা হবে। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দলের ২৬ জন করে মোট ১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের ডিজিটাল স্ক্যান নেওয়া হবে। একটি বিশেষ কক্ষে মাত্র এক সেকেন্ডে এই স্ক্যান সম্পন্ন করা যাবে এবং এটি টুর্নামেন্ট শুরুর আগে একবারই করতে হবে।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অফসাইডের সিদ্ধান্ত টেলিভিশন সম্প্রচার ও স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় আরও স্পষ্ট থ্রিডি অ্যানিমেশনের মাধ্যমে দেখানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি, বলের অবস্থান নির্ধারণেও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, যা গোলের আগে বল মাঠের সীমানা অতিক্রম করেছিল কি না তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করবে।

এছাড়া বলের ভেতরে সংযুক্ত বিশেষ চিপের মাধ্যমে জানা যাবে সর্বশেষ কোন খেলোয়াড় বল স্পর্শ করেছেন। ফলে কর্নার বা থ্রো-ইন সিদ্ধান্ত যাচাই করাও সহজ হবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে খেলার স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিতর্ক কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে ফিফা।

Leave a Comment