বিশ্বকাপ চলাকালে মেক্সিকোয় অবস্থান করবে ইরান জাতীয় দল

ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রস্তুতি কার্যক্রম চলমান থাকলেও ইরান জাতীয় ফুটবল দলকে ঘিরে একটি ব্যতিক্রমী লজিস্টিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে টুর্নামেন্ট চলাকালে ইরানি দলের তাদের ভূখণ্ডে অবস্থানের বিষয়ে আপত্তি জানানোর পর আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা বিকল্প ব্যবস্থার উদ্যোগ নেয় এবং মেক্সিকোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন আবাসন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। পরবর্তীতে মেক্সিকো সরকার ইরান জাতীয় দলকে বিশ্বকাল চলাকালে তাদের দেশে আতিথ্য দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি প্রদান করে।

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শিনবাউম সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বিশ্বকাপ চলাকালে ইরান ফুটবল দলকে মেক্সিকোতে অবস্থানের সুযোগ দিতে তার দেশ প্রস্তুত রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি স্কোয়াডকে টুর্নামেন্ট চলাকালে তাদের ভূখণ্ডে অবস্থানের অনুমতি না দেওয়ার অবস্থান জানালে ফিফা বিষয়টি নিয়ে মেক্সিকো সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মেক্সিকো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি না থাকায় তারা ইরান দলকে গ্রহণে সম্মত হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ইরান জাতীয় দলের তিনটি ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও দলটির আবাসন ও প্রস্তুতি ক্যাম্পকে ঘিরে জটিলতা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে ফিফার মধ্যস্থতায় ইরান তাদের মূল বেস ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর টিহুয়ানাতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দলটির প্রস্তুতি এবং ভ্রমণ ব্যবস্থাপনায় একটি বিকল্প কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ফিফার অনুমোদন নিয়েই এই স্থানান্তর কার্যকর করা হচ্ছে। তার মতে, মেক্সিকোতে ক্যাম্প স্থাপন করলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ সংক্রান্ত ভিসা জটিলতা এবং ভ্রমণ-সম্পর্কিত প্রশাসনিক বাধা অনেকাংশে কমে যাবে। একই সঙ্গে খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের জন্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল প্রস্তুতির পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

টিহুয়ানা শহরটি যুক্তরাষ্ট্র–মেক্সিকো সীমান্তের কাছে অবস্থিত হওয়ায় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। শহরটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসসহ বিশ্বকাপের বিভিন্ন সম্ভাব্য ভেন্যুতে আকাশপথে যাত্রার সময় এক ঘণ্টারও কম। ফলে ইরান জাতীয় দল মেক্সিকোতে অবস্থান করেই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ম্যাচ খেলতে পারবে এবং পুনরায় তাদের বেস ক্যাম্পে ফিরে আসতে পারবে। এই ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত সীমান্ত-পারাপার লজিস্টিক মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন কারণে সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সামরিক উত্তেজনার পর বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ এবং তাদের দলীয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ফিফা পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প আবাসন ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

ফিফা সাধারণভাবে বিশ্বকাপের মতো বৃহৎ টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতি, নিরাপত্তা এবং লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করতে আয়োজক দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে থাকে। এবারের ক্ষেত্রেও একই কাঠামোর অংশ হিসেবে মেক্সিকোকে বিকল্প আবাসন কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এই ধরনের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে বিরল হলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে তা কার্যকর করা হয়ে থাকে।

ইরান জাতীয় ফুটবল দল, যা ‘টিম মেলি’ নামে পরিচিত, ইতোমধ্যে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি কার্যক্রম শুরু করেছে। বেস ক্যাম্প স্থানান্তরের ফলে তাদের প্রস্তুতি সূচিতে কিছু সমন্বয় করতে হচ্ছে, তবে ফেডারেশন জানিয়েছে যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দলীয় প্রস্তুতি অব্যাহত থাকবে। কোচিং স্টাফ ও ব্যবস্থাপনা দল এই পরিবর্তিত কাঠামোর মধ্যে প্রস্তুতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে।

বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরে অনেক সময় রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক লজিস্টিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। ইরানের ক্ষেত্রে মেক্সিকোতে অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলার এই ব্যবস্থা সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই প্রতিফলন, যেখানে ক্রীড়া আয়োজনের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমন্বয় এবং প্রশাসনিক সহযোগিতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

Leave a Comment