ব্যায়ামের শির আসন (শীর্ষাসন) । ২০ নম্বর ব্যায়ামের নিয়ম । খেলাধুলার নিয়ম

আজকের আলোচনার বিষয় ব্যায়ামের শির আসন (শীর্ষাসন)। এই আসনটিকে যোগব্যায়ামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী আসন হিসেবে ধরা হয়। শির আসনে দেহের প্রায় সম্পূর্ণ ওজন মাথা ও কনুইয়ের উপর এসে পড়ে। সে কারণেই একে শির আসন বা শীর্ষাসন বলা হয়।

শির আসন শুধু একটি ব্যায়াম নয়, বরং এটি শরীর ও মনের উপর গভীর প্রভাব বিস্তারকারী একটি বিশেষ আসন। নিয়মিত ও সঠিকভাবে চর্চা করলে এটি দেহের রক্ত সঞ্চালন, স্নায়ুতন্ত্র ও মানসিক শক্তিকে ব্যাপকভাবে উন্নত করে।

এই পাঠটি আমাদের “খেলাধুলার নিয়ম” ধারাবাহিক সিরিজের অন্তর্গত “ব্যায়ামের নিয়ম” অধ্যায়ের ২০ নম্বর ব্যায়াম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।

শীর্ষাসন

 

ব্যায়ামের শির আসন (শীর্ষাসন) । ২০ নম্বর ব্যায়ামের নিয়ম । খেলাধুলার আইন

 

আসন করার নিয়ম

শির আসন করার সময় ধৈর্য, মনোযোগ ও সঠিক ভঙ্গি অত্যন্ত জরুরি। নিচে ধাপে ধাপে আসনটি করার নিয়ম বর্ণনা করা হলো—

  1. প্রথমে পা গুটিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে মাটিতে বসুন।
  2. এরপর মাথা নিচু করে ব্রহ্মতালু হাঁটুর সামনে রাখা প্যাড বা নরম কাপড়ের ওপর রাখুন।
  3. দু’হাতের আঙুল শক্ত করে পরস্পরের মধ্যে গাঁথুন এবং মাথার নিচে রাখুন। অর্থাৎ, হাতের তালুর সহায়তায় মাথাকে ধরে রাখুন।
  4. খেয়াল রাখবেন—দু’টি কনুই অবশ্যই মাটিতে থাকবে এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকবে।
  5. এবার মাথা ও কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটুর ভাঁজ খুলে নিন।
  6. হাঁটু সোজা করার সময় দু’পা যেন একসঙ্গে থাকে—এ বিষয়ে সতর্ক থাকুন।
  7. এরপর কোমর সোজা রেখে ধীরে ধীরে পা দু’টি উপরের দিকে তুলুন।

প্রথম দিকে এই আসনটি একা একা করা সহজ নয়। তাই শুরুতে দেয়ালের পাশে বসে দেয়ালের সাহায্য নিয়ে অনুশীলন করা যেতে পারে। এতে ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয় এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।

যখন সম্পূর্ণভাবে পা দু’টি সোজা হয়ে উপরের দিকে উঠে যাবে, তখন প্রায় আধ মিনিট লম্ব অবস্থায় থাকুন। এই সময় আপনার দেহ মাটির সঙ্গে সমকোণ (৯০ ডিগ্রি কোণ) তৈরি করবে। যখন এই ভঙ্গিটি ঠিকভাবে তৈরি হবে, তখনই বুঝবেন আসনটি সঠিকভাবে চর্চা করা হচ্ছে।

নির্ধারিত সময় শেষে আস্তে ধীরে পা নামিয়ে আনুন এবং এরপর বিলীন আসনে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন। উল্লেখযোগ্য যে, শির আসন সাধারণত ব্যায়ামের শেষ দিকে করা উত্তম

শির আসনের উপকারিতা

শির আসনের উপকারিতা বহুমুখী এবং গভীর। এই আসনে শরীরের অবস্থান উল্টো হওয়ায় হৃদপিণ্ড মাথার তুলনামূলক নিচে থাকে এবং মাথার দিকে রক্ত প্রবাহ বেড়ে যায়।

এর ফলে—

  • মস্তিষ্কে সহজে ও পর্যাপ্ত রক্ত সঞ্চালন হয়
  • মগজ, গলদেশ ও মুখমণ্ডলে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়
  • মাথার সমস্ত স্নায়ুতন্ত্রে রক্তের প্লাবন ঘটে

এর ফলশ্রুতিতে—

  • চোখ, কান, নাক ও মুখগহ্বরের বিভিন্ন অংশে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৌঁছে যায়
  • পেশী, স্নায়ুতন্ত্র ও বিভিন্ন গ্রন্থি সতেজ ও সক্রিয় হয়ে ওঠে
  • মনের শক্তি, স্মৃতিশক্তি ও ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধি পায়
  • দৃষ্টিশক্তি প্রখর হয়

নিয়মিত শির আসন চর্চার মাধ্যমে নিচের সমস্যাগুলো থেকেও উপকার পাওয়া যায়—

  • কর্মবিমুখতা
  • মাথাধরা
  • লিকুরিয়া
  • রক্তাল্পতা
  • অর্শ্ব
  • হাঁপানি
  • একশিরা (ভ্যারিকোজ ভেইন)

 

 

মনে রাখবেন (সতর্কতা)

শির আসন অত্যন্ত উপকারী হলেও এটি সবার জন্য উপযোগী নয়। তাই কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে—

  • শুধুমাত্র স্বাভাবিক সুস্থ অবস্থায় এই আসন চর্চা করবেন
  • হৃদরোগীরা রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় না হওয়া পর্যন্ত শির আসন করা থেকে বিরত থাকবেন
  • অল্পবয়সী বালক-বালিকাদের জন্য এই আসন করা উপযুক্ত নয়
  • প্রথম দিকে অবশ্যই অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক বা সহায়কের উপস্থিতিতে অনুশীলন করা ভালো

 

শির আসন বা শীর্ষাসন হলো যোগব্যায়ামের এক অনন্য ও শক্তিশালী আসন, যা শরীরের রক্তসঞ্চালন, স্নায়ুতন্ত্র ও মানসিক শক্তির উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
তবে যেহেতু এটি একটি উল্টো ভঙ্গির আসন, তাই নিয়ম মেনে, ধীরে ধীরে এবং সতর্কতার সঙ্গে চর্চা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

Leave a Comment