বাংলাদেশে কেউ নেইমার, মেসি কিংবা জিদান নামধারী আছেন কি না, তা নিয়ে কৌতূহল অনেকেরই থাকতে পারে। ফুটবলপাগল এই দেশে এমন নাম শোনা একেবারে অচেনা নয়। তবে ব্রাজিলে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা যে কতটা গভীর, তা বোঝা যায় এক নজরে তাদের নামের তালিকা দেখলেই। সেখানে ফুটবলের কিংবদন্তিদের নামে সন্তানদের নাম রাখার রেওয়াজ যেন এক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল—যাদের জীবনের প্রতিটি ধাপে ফুটবলের ছোঁয়া। সম্প্রতি ব্রাজিলের ভূগোল ও পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট (আইবিজিই) ২০২২ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে দেশটির জনপ্রিয় নামের তালিকা প্রকাশ করেছে। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশটির সংবাদমাধ্যম গ্লোবো বের করেছে—কোন ফুটবলারের নামে সবচেয়ে বেশি মানুষের নাম রাখা হয়েছে।
ফলাফল দেখলে অবাক হতে হয়। দেখা যাচ্ছে, ব্রাজিলজুড়ে ফুটবলারদের নাম বা উপাধি এখন মানুষের পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে। যেমন কেউ যদি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ভক্ত হন, তবে পুরো নাম নয়—শুধু “ক্রিস্টিয়ানো” বা “রোনালদো” রাখেন নিজের সন্তানের নাম হিসেবে।
জনপ্রিয় ফুটবল তারকাদের নামে নামধারী মানুষের সংখ্যা
| নাম | মোট সংখ্যা | নারী | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| নেইমার | ২,৪৪৩ | ৫০ | জনপ্রিয়তা বেড়েছে ২০০৯ সালের পর |
| রিকেলমে | ২৫,৯৪২ | — | এর মধ্যে অনেকেই পদবি হিসেবে ব্যবহার করেন |
| রিকুয়েলমে | ৩৩৮ | — | রিকেলমের ভিন্ন উচ্চারণভিত্তিক নাম |
| মেসি | ৩৬৩ | — | নাম হিসেবে |
| মেসি (পদবি) | ৭৫৫ | — | পদবি হিসেবে |
| ম্যারাডোনা | ১২৮ | — | নাম হিসেবে |
| ম্যারাডোনা (পদবি) | ৪৪৭ | — | পদবি হিসেবে |
| রোমারিও | ৩২,১১০ | — | ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের পর জনপ্রিয়তা |
| বেবেতো | ২৪৭ | — | আসল নাম জোসে রবার্তো গামা দে অলিভেইরা |
| রোনালদিনিও | ১৮৭ | — | ডাকনাম হয়েও আনুষ্ঠানিক নাম |
| কাকা | ১২১ | — | ডাকনামভিত্তিক নাম |
| জিকো | ৫৮২ | — | ‘সাদা পেলে’ হিসেবে খ্যাত |
| পেলে | ৭৫ | — | তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কিংবদন্তি |
| পেলে (পদবি) | ১৫৪ | — | উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত |
আইবিজিই–এর তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিলে নেইমার নামধারী মানুষের সংখ্যা এখন ২,৪৪৩। ২০০৯ সালে সান্তোসের হয়ে তাঁর অভিষেকের আগে সংখ্যাটি ছিল এক শতকেরও নিচে। অর্থাৎ নেইমারের উত্থানকালেই জন্ম নিয়েছে অধিকাংশ “নেইমার”। বর্তমানে এ নামধারীদের গড় বয়স ১১ বছর। নেইমার হয়তো ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারেননি, কিন্তু ব্রাজিলিয়ানদের হৃদয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা অটুট।
দেশটির ২৭টি রাজ্যেই নেইমার নামধারী মানুষ আছেন। সবচেয়ে বেশি মিনাস গেরাইসে (৩৭২ জন), এরপর সাও পাওলো (৩৪০), আমাজোনাস (২৩৯) এবং বাহিয়ায় (২৩২)।
অবাক করার বিষয় হলো—নেইমারের চেয়েও জনপ্রিয় হয়েছেন এক আর্জেন্টাইন ফুটবলার, হুয়ান রোমান রিকেলমে! ব্রাজিলে “রিকেলমে” নামধারী মানুষের সংখ্যা ২৫,৯৪২। তাদের গড় বয়স প্রায় ১২ বছর। ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত, যখন রিকেলমে কোপা লিবার্তোদোরেসে বোকা জুনিয়র্সকে তিনবার (২০০০, ২০০১, ২০০৭) শিরোপা জেতান, তখনই নামটির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়।
১৯৯০ সালের শুরুর দিকে ব্রাজিলে রিকেলমে নামধারী ছিলেন মাত্র ২২৮ জন। এক দশক পর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২,২২০। বর্তমানে সাও পাওলো রাজ্যে রিকেলমে নামধারীর সংখ্যা ৩,৭৯৮ এবং বাহিয়ায় ৩,৭৭৩।
বিশ্বকাপ জয় মানেই ব্রাজিলিয়ানদের জীবনে নতুন নামের ঢেউ। ১৯৯৪ সালে রোমারিও ও বেবেতোর যুগলবন্দিতে বিশ্বকাপ জয়ের পর “রোমারিও” নামধারীর সংখ্যা ৯,০০০ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৩২,০০০-এরও বেশি। বর্তমানে রোমারিও ও বেবেতো নামধারীদের গড় বয়স ২৯ বছর।
ব্রাজিলে শুধু আনুষ্ঠানিক নাম নয়, ডাকনামও হয়ে গেছে নাগরিক পরিচয়। “রোনালদিনিও”, “কাকা”, “জিকো”—সবই এখন জন্মনিবন্ধনের আনুষ্ঠানিক নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
শেষ পর্যন্ত ফুটবলে ব্রাজিলিয়ানদের একটাই দর্শন—তারা শুধু ফুটবল খেলে না, ফুটবলের মধ্য দিয়েই বাঁচে। নামেই তার প্রমাণ মেলে।
