কাতার বা আমেরিকার সবুজ গালিচায় যখনই সেলেসাওরা নামে, তখন বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি হয়। এবার বিশ্বকাপের শেষ ১৬-র রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবং ইউরোপের উদীয়মান পরাশক্তি নরওয়ে। আর্লিং হালান্ডের নরওয়ের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে মাঠের বাইরের পরিসংখ্যান ও ডেটা অ্যানালিটিক্স এই ম্যাচটিকে এক চরম নাটকীয় রূপ দিয়েছে। ডেটা বিশ্লেষণকারী শীর্ষস্থানীয় ওয়েবসাইট ‘অপ্টা অ্যানালিস্ট’-এর সুপারকম্পিউটার এই ম্যাচের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ব্রাজিলের পক্ষে রায় দিলেও, অতীত ইতিহাস কিন্তু ব্রাজিলের সমর্থকদের মনে কিছুটা ভয়ের কাঁপন ধরাচ্ছে।
ব্রাজিলের ধারাবাহিকতা ও আক্রমণভাগের গোলখরা
গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডে জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিলের ২-১ ব্যবধানের জয়টি ছিল এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন। হিউস্টনে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে কাইশু সানোর গোলে প্রথমে পিছিয়ে পড়েছিল ব্রাজিল। তবে অভিজ্ঞ কাসেমিরোর সমতাসূচক গোলের পর শেষ মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির চমৎকার ফিনিশিংয়ে জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে সেলেসাওরা। মার্তিনেল্লির এই গোলে অ্যাসিস্ট করে নতুন এক কীর্তি গড়েন ব্রুনো গিমারায়েস। চলতি আসরে এটি তাঁর চতুর্থ অ্যাসিস্ট। এক বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে তাঁর চেয়ে বেশি অ্যাসিস্টের রেকর্ড আছে কেবল ফুটবল সম্রাট পেলের (১৯৭০ বিশ্বকাপে ৬টি)।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে টানা চার ম্যাচে জয়লাভ করল ব্রাজিল। ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে টানা ১১ ম্যাচ জয়ের পর, এটিই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ ধারাবাহিক জয়ের রেকর্ড। তা ছাড়া, বিশ্বকাপের শেষ ১৬ বা রাউন্ড অব সিক্সটিনের মঞ্চ ব্রাজিলের জন্য বেশ পয়া। এই পর্বে খেলা শেষ ১০টি ম্যাচের মধ্যে তারা মাত্র একবার হেরেছে—১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে।
তবে দলটির ইতালীয় কোচ কার্লো আনচেলত্তির জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর আক্রমণভাগের কার্যকারিতা। ব্রাজিল দল মাঠে একক আধিপত্য বজায় রাখলেও স্ট্রাইকাররা সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারছেন না। চলতি আসরে ৪ ম্যাচে ব্রাজিল প্রতিপক্ষের গোল অভিমুখে মোট ৬০টি শট নিয়েছে। ম্যাচ প্রতি শটের এই গড় (১৫টি) ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের পর (ম্যাচ প্রতি ১৪.৪ শট) তাদের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন শটের রেকর্ড। নকআউটের মরণ-বাঁচন ম্যাচে এই ফিনিশিংয়ের অভাব ব্রাজিলের জন্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
হালান্ড-ম্যানিয়া এবং নরওয়ের ঐতিহাসিক রূপকথা
অন্যদিকে, ইউরোপের প্রতিনিধি নরওয়ে ফুটবল দল এখন তাদের সোনালী প্রজন্মের হাত ধরে নতুন ইতিহাস লিখছে। শেষ ৩২-এর ম্যাচে আইভরি কোস্টকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে তারা নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জয়ের স্বাদ পেয়েছে। আর এই রূপকথার মহানায়ক আর কেউ নন, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। ম্যাচের ৮৬তম মিনিটে তাঁর করা দুর্দান্ত গোলটিই নরওয়েকে এই ঐতিহাসিক জয় এনে দেয়। এর আগে ১৯৩৮ এবং ১৯৯৮ সালে নরওয়ে নকআউট পর্বে উঠলেও দুবারই ইতালির কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল।
ব্রাজিলিয়ান রক্ষণভাগের জন্য হালান্ডকে রুখে দেওয়া হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনি বর্তমানে এক অবিশ্বাস্য গোল-মেশিনে পরিণত হয়েছেন। নিজের খেলা শেষ ১৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তিনি একাই করেছেন ২৫টি গোল! ব্রাজিলের বিপক্ষে এই ম্যাচে জালের দেখা পেলে অষ্টম ইউরোপীয় খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম চার ম্যাচের প্রতিটিতে গোল করার অনন্য এক কীর্তি গড়বেন এই নরওয়েজীয় তারকা।
নকআউটের ভূত বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গাণিতিক হিসাব
ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক বাধা হলো তাদের অতীত ইতিহাস এবং নকআউটে ইউরোপীয় জুজু। ফুটবলের ইতিহাসে ব্রাজিল ও নরওয়ে এ পর্যন্ত চারবার মুখোমুখি হয়েছে, যার একটিতেও ব্রাজিল জিততে পারেনি। নরওয়ে জিতেছে দুটি ম্যাচ, আর বাকি দুটি হয়েছে ড্র। তার চেয়েও বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, ২০০২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারানোর পর থেকে দীর্ঘ ২৪ বছরে বিশ্বকাপে কোনো ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে নকআউট পর্বে জয়ের মুখ দেখেনি ব্রাজিল।
ইতিহাস নরওয়েকে মানসিকভাবে এগিয়ে রাখলেও আধুনিক প্রযুক্তির সুপারকম্পিউটার কিন্তু আবেগে ভাসছে না। ‘অপ্টা সুপারকম্পিউটার’ লাখো ডেটা ও গাণিতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, নির্ধারিত ৯০ মিনিটের মধ্যে ব্রাজিলের সরাসরি জয়ের সম্ভাবনা ৫৩.৬ শতাংশ। বিপরীতে নরওয়ের জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ২২.৪ শতাংশ। আর ম্যাচটি নির্ধারিত সময়ে ড্র হয়ে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর সম্ভাবনা ২৪ শতাংশ।
যদি অতিরিক্ত সময় বা টাইব্রেকারের হিসাবও যুক্ত করা হয়, তবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার ক্ষেত্রে ব্রাজিলের সামগ্রিক সম্ভাবনা দাঁড়ায় ৬৫.৬ শতাংশ, যেখানে নরওয়ের সম্ভাবনা মাত্র ৩৪.৫ শতাংশ। ফুটবল ইতিহাস বনাম আধুনিক প্রযুক্তির এই দ্বৈরথে শেষ পর্যন্ত কার মুখে শেষ হাসি ফুটবে, তা দেখার জন্য মুখিয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব। এই ম্যাচের জয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড অথবা মেক্সিকোর।
