প্রথমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করেছে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দেশটি অভিষেক আসরেই দুর্দান্ত নৈপুণ্য, শৃঙ্খলিত দলীয় খেলা এবং লড়াকু মানসিকতার মাধ্যমে সমর্থক, বিশ্লেষক ও নিরপেক্ষ ফুটবলপ্রেমীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। শিরোপার লড়াই থেকে বিদায় নিলেও তাদের স্মরণীয় অভিযানের স্বীকৃতি হিসেবে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন পাচ্ছে প্রায় ২৫৯ কোটি টাকার আর্থিক পুরস্কার।
গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের পারফরম্যান্স ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় চমক। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচেই ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে আলোচনায় উঠে আসে দলটি। দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী উরুগুয়ের বিপক্ষে দুইবার পিছিয়ে পড়েও ২-২ সমতা ফিরিয়ে আনে তারা। শেষ গ্রুপ ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষেও গোলশূন্য ড্র করে অপরাজিত থেকেই নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করে কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপের অভিষেক মঞ্চে এমন ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেশটির ফুটবল ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে কেপ ভার্দের প্রতিপক্ষ ছিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে রক্ষণাত্মক কৌশলে সীমাবদ্ধ না থেকে সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেছে তারা। ম্যাচে দুইবার পিছিয়ে পড়েও দুইবারই সমতায় ফিরেছিল কেপ ভার্দে। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের ১১১তম মিনিটে আত্মঘাতী গোলে ৩-২ ব্যবধানে হারতে হলেও তাদের লড়াই দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। পরাজয়ের পরও কেপ ভার্দে সম্মান নিয়েই বিশ্বকাপ অভিযান শেষ করেছে।
মাঠের এই সাফল্যের প্রতিফলন মিলছে আর্থিক পুরস্কারেও। ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দলের জন্য ফিফা মোট ৮৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রাইজমানি নির্ধারণ করেছে, যা আগের আসরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দল নির্ধারিত অঙ্কের অর্থ পাচ্ছে। পাশাপাশি প্রস্তুতি, ভ্রমণ ও সাংগঠনিক ব্যয়ের জন্যও আলাদা অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নকআউট পর্বে ওঠা দলগুলোর জন্য রয়েছে অতিরিক্ত প্রাইজমানির ব্যবস্থাও।
ফিফার নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার জন্য প্রতিটি দল পাবে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রস্তুতি, ভ্রমণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য আরও ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রয়েছে। শেষ ৩২ থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলো অতিরিক্ত ১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাবে। সব মিলিয়ে কেপ ভার্দের মোট প্রাপ্তি দাঁড়াবে অন্তত ২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫৯ কোটিরও বেশি।
এই অর্থ কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশনের তহবিলে জমা হবে। ভবিষ্যতে দেশের ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ, বয়সভিত্তিক দল গঠন, কোচ ও খেলোয়াড় তৈরির কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই অর্থ ব্যয় করার সুযোগ তৈরি হবে। ফুটবল সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিনিয়োগ কেপ ভার্দের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের এই যাত্রা আবারও প্রমাণ করেছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে সাফল্যের জন্য শুধু বড় জনসংখ্যা বা বিপুল অর্থই যথেষ্ট নয়। সুপরিকল্পিত ফুটবল কাঠামো, কার্যকর প্রশিক্ষণ, দলীয় সংহতি এবং অদম্য আত্মবিশ্বাস থাকলে ছোট দেশও বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গে সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। অভিষেক বিশ্বকাপেই কেপ ভার্দে সেই বার্তাই শক্তভাবে তুলে ধরেছে এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
