
মেসির ছায়ায় নিকো পাজ, আর্জেন্টিনার নতুন স্বপ্নের নায়ক
বিশেষ করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে কোমোর ৪-১ গোলের জয়ে পাজের অসাধারণ পারফরম্যান্স তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ম্যাচটিতে দুটি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থকে দিয়ে আরও একটি গোল করিয়েছেন তিনি। আক্রমণভাগে তাঁর গতিশীলতা, সুযোগ তৈরির দক্ষতা এবং নিখুঁত ফিনিশিং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বারবার বিপদে ফেলেছে।
পাজের খেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক তাঁর বাঁ পায়ের ব্যবহার। মেসির মতোই বাঁ পায়ে বল নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া, ছোট ছোট পাসে আক্রমণ সাজানো এবং দূর থেকে বাঁকানো শটে গোল করার দক্ষতা রয়েছে তাঁর। ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচের শুরুতেই তাঁর করা গোলটি অনেকের মনে করিয়ে দিয়েছে মেসির পরিচিত গোল করার ভঙ্গি।
শুধু খেলার ধরন নয়, পরিসংখ্যানেও মেসির সঙ্গে পাজের তুলনা টানা হচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে গোল করা দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। এই তালিকায় প্রথমে রয়েছেন মেসি, যিনি ২০০৯ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ইউনাইটেডের বিপক্ষে গোল করেছিলেন।
স্পেনের তেনেরিফে জন্ম নেওয়া নিকো পাজের ফুটবলের সঙ্গে পরিচয় পারিবারিকভাবেই। তাঁর বাবা পাবলো পাজ আর্জেন্টিনার সাবেক পেশাদার ফুটবলার। বাবার ফুটবলীয় অভিজ্ঞতা এবং নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে ছোটবেলা থেকেই পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন নিকো।
ফুটবলে তাঁর বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রিয়াল মাদ্রিদ। স্প্যানিশ জায়ান্টদের বয়সভিত্তিক দলে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেওয়ার পর ইতালিয়ান ক্লাব কোমোয় যোগ দেন তিনি। সেখানে নিয়মিত খেলার সুযোগ তাঁর ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সময়ের সঙ্গে দলের আক্রমণভাগের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন এই তরুণ।
কোমোর হয়ে পাজের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ক্লাবটির কোচ সেস্ক ফ্যাব্রেগাস। স্পেনের সাবেক এই তারকা মিডফিল্ডার নিজেও একসময় বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলেছেন। ফলে তরুণ প্রতিভাদের সামর্থ্য ও সম্ভাবনা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাজের পরিণত ফুটবল এবং মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা ফ্যাব্রেগাসকেও মুগ্ধ করেছে।
সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও পাজের সম্ভাবনার পক্ষে কথা বলছে। কোমো ও আর্জেন্টিনা জাতীয় দল মিলিয়ে সর্বশেষ ১১ ম্যাচে সাতটি গোল করার পাশাপাশি ছয়টি গোলে সহায়তা করেছেন তিনি। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে সরাসরি ১৩টি গোলে অবদান রেখেছেন তরুণ এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার।
তাঁর এমন ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধুনিক ফুটবলে একজন আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের দায়িত্ব শুধু গোল করা নয়, সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করা এবং দলের আক্রমণকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করাও। পাজের খেলায় এসব গুণের উপস্থিতি তাঁকে অন্য অনেক তরুণ ফুটবলারের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
ইউনাইটেডের বিপক্ষে স্মরণীয় পারফরম্যান্সের পর নিজের উচ্ছ্বাস লুকাননি পাজ। ম্যাচটি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম সুন্দর ম্যাচ। কখনো ভুলব না। এটা আমার স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু।’
তবে মেসির উত্তরসূরি হওয়ার আলোচনা যেমন সম্মানের, তেমনি এটি বড় ধরনের প্রত্যাশার চাপও তৈরি করতে পারে। প্রায় দুই দশক ধরে আর্জেন্টিনার ফুটবলে মেসি যে অসাধারণ মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, সেটির সঙ্গে কোনো তরুণ ফুটবলারের তুলনা করা সহজ নয়।
মেসির অসাধারণ গোল করার দক্ষতা, খেলা পরিচালনার ক্ষমতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পাজকে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়ও পাজের মতো প্রতিভাবান ফুটবলারদের গুরুত্ব বাড়তে পারে। বিশেষ করে আক্রমণভাগে সৃজনশীলতা, মাঝমাঠ থেকে গোলের সুযোগ তৈরি এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা জাতীয় দলের জন্য মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
আপাতত নিকো পাজ নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই ফুটবলবিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সির ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে তাঁকে ঘিরে প্রত্যাশা বাড়লেও নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করাই হবে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কোমোর নীল জার্সিতে যে প্রতিভার ঝলক দেখাচ্ছেন এই তরুণ, তা ধরে রাখতে পারলে আগামী দিনে আর্জেন্টিনার ফুটবলে আরও বড় ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে তাঁর। তবে মেসির উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় থাকা আর তাঁর অর্জনের সমপর্যায়ে পৌঁছানো যে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, সেটিও সময়ই নির্ধারণ করবে।