আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে লিওনেল মেসির অবসরের ঘোষণায় ফুটবলবিশ্বে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তবে সবচেয়ে ব্যক্তিগত ও হৃদয়ছোঁয়া প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি এসেছে মেসির মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনির কাছ থেকে। ছেলের আন্তর্জাতিক ফুটবলের পথচলা শেষ হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে তার এখনো কষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
স্পেনের কাছে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজয়ের পরই ৩৯ বছর বয়সী মেসি আর্জেন্টিনার জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। যদিও পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা আগে থেকেই তার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতেন, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর বিষয়টি তাদের জন্যও আবেগের হয়ে ওঠে।
স্পেনের কাছে হারের পর মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায় শেষ হওয়ার খবরে সমর্থকদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলা এই তারকার বিদায় মানে শুধু একজন ফুটবলারের অবসর নয়, বরং দেশটির ফুটবল ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি।
আমেরিকা টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি বলেন, ছেলেকে আর আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলতে দেখা যাবে না—এই বাস্তবতা এখনো তার কাছে সহজ মনে হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “খেলার সময় তাদের দিকে তাকালে আমার এখনো চোখে পানি চলে আসে। বিষয়টি আমরা আগেই জানলেও পুরো পরিবার খুব কষ্ট পেয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, সে এখন ভালো আছে এবং খুশি আছে।”
মেসির মা একই সঙ্গে স্মরণ করেছেন তার প্রয়াত স্বামী হোর্হে মেসিকে। ছেলের ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হোর্হে ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। মেসি একদিন খেলবেন না—এই ভবিষ্যতের কথা ভেবে হোর্হে প্রায়ই আবেগ প্রকাশ করতেন।
সেলিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, হোর্হে বলতেন, “সে যখন আর খেলবে না, তখন আমি কী করব?” স্বামীর মৃত্যুর পর সেই কথাগুলো এখন আরও বেশি আবেগের সঙ্গে মনে পড়ছে বলে জানান তিনি।
জাতীয় দল থেকে বিদায়ের বার্তায় মেসি নিজেও তরুণদের জন্য জায়গা তৈরি করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ সময় দেশের হয়ে খেলার পর নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। তার সিদ্ধান্তে প্রজন্ম বদলের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক হয় মেসির। এরপর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি দেশের হয়ে ২০৭ ম্যাচ খেলেছেন, করেছেন ১২৫ গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েছেন ৬৮ বার। এসব পরিসংখ্যান তাকে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির সাফল্যের তালিকাও দীর্ঘ। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতেন তিনি। এরপর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলেন। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাতেও আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেন এই তারকা।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির পথচলা ছিল উত্থান-পতনে ভরা। শুরুর দিকে একাধিক বড় টুর্নামেন্টে হতাশা এলেও সময়ের সঙ্গে তিনি আর্জেন্টিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন। শেষ পর্যন্ত একাধিক আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে নিজের জাতীয় দলের অধ্যায়কে সাফল্যের উচ্চতায় নিয়ে যান।
এখন আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসিকে আর মাঠে দেখা যাবে না—এই বাস্তবতাই তার পরিবার, সতীর্থ এবং কোটি কোটি সমর্থকের সামনে নতুন এক অধ্যায় খুলে দিয়েছে। মায়ের চোখে জমে থাকা জল আর প্রয়াত বাবার পুরোনো কথাগুলো সেই বিদায়ের আবেগকে আরও ব্যক্তিগত করে তুলেছে।
