স্প্যানিশ ফুটবল জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। উরুর চোট, ব্যক্তিগত জীবন এবং আচরণগত বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সমর্থকরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। এই অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এমবাপ্পেকে ক্লাব থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে শুরু হওয়া একটি অনলাইন পিটিশনে অভাবনীয় সাড়া পাওয়া গেছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পিটিশনটিতে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন বা ৪ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ স্বাক্ষর করেছেন, যা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে।
Table of Contents
অনলাইন পিটিশন: “এমবাপ্পে আউট”
রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকদের একটি অংশ মূলত ক্লাবের শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে “এমবাপ্পে আউট” শীর্ষক এই অনলাইন প্রচার শুরু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে আয়োজকদের লক্ষ্য ছিল মাত্র ২ লক্ষ সমর্থকের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই স্বাক্ষরের সংখ্যা ৪৫ মিলিয়নের মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
পিটিশন পেজটিতে কিলিয়ান এমবাপ্পের ছবির ওপর লাল রঙে বড় অক্ষরে ‘আউট’ (OUT) লিখে দেওয়া হয়েছে। সেখানে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে একটি বার্তায় বলা হয়েছে, ‘যদি সত্যিই ক্লাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন, তবে চুপ থাকবেন না, কথা বলুন।’ যদিও এই বিপুল সংখ্যক স্বাক্ষরের সত্যতা ও আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যেহেতু সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে পরিচয় যাচাই বা ইমেইল ভেরিফিকেশনের কড়াকড়ি নেই, তাই একজন ব্যক্তি একাধিকবার স্বাক্ষর করেছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তবুও পরিসংখ্যানটি এমবাপ্পের ওপর জনরোষের গভীরতা ফুটিয়ে তুলছে।
বিতর্কের নেপথ্যে: উরুর চোট ও ছুটি কাটানো
এমবাপ্পের প্রতি সমর্থকদের এই বিরাগের মূল কারণ হিসেবে তাঁর অপেশাদার আচরণকে দায়ী করা হচ্ছে। উরুর চোটে আক্রান্ত হয়ে যখন তাঁর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্রামে ও পুনর্বাসনে থাকার কথা ছিল, ঠিক সেই সময়েই ইতালির সার্ডিনিয়া দ্বীপে ইয়টে তাঁর ছুটি কাটানোর ছবি প্রকাশ্যে আসে। বিশেষ করে স্প্যানিশ অভিনেত্রী এস্টার এক্সপোসিতোর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রিয়াল সমর্থকরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। গুরুত্বপূর্ণ ‘এল ক্লাসিকো’র ঠিক আগে তাঁর এমন উদাসীনতা সমর্থকদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। চাপের মুখে অভিনেত্রী এক্সপোসিতো তাঁর অ্যাকাউন্টের মন্তব্যের ঘর বন্ধ করে দিলেও ভক্তরা তাঁর পুরনো পোস্টে গিয়ে ক্ষোভ ঝাড়ছেন।
ড্রেসিংরুমের শৃঙ্খলা ও আচরণগত প্রশ্ন
কেবল মাঠের বাইরের জীবন নয়, ক্লাবের অভ্যন্তরেও এমবাপ্পের আচরণ নিয়ে অসন্তোষ দানা বাঁধছে। সম্প্রতি অনুশীলনের সময় একটি গোল করাকে কেন্দ্র করে দলের সাপোর্ট স্টাফের সঙ্গে তাঁর দুর্ব্যবহারের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এর ফলে ড্রেসিংরুমে সতীর্থ ও কোচিং স্টাফদের মধ্যে এই ফরাসি তারকাকে নিয়ে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
কট্টর মাদ্রিদিস্তাদের মতে, রিয়াল মাদ্রিদের সাদা জার্সি গায়ে জড়ানোর যে ঐতিহ্য ও শৃঙ্খলাবোধ প্রয়োজন, এমবাপ্পে তা প্রদর্শনে ব্যর্থ হচ্ছেন। এর আগে পিএসজিতে থাকাকালীনও লিওনেল মেসি এবং নেইমারের সঙ্গে তাঁর তিক্ত সম্পর্ক ফুটবল বিশ্বে ‘ওপেন সিক্রেট’ ছিল। রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান ট্রফি খরা এবং মাঠের পারফরম্যান্সের চাপের মধ্যে পুরনো সেই বিতর্কগুলো নতুন করে সামনে আসছে।
ক্লাব ও কোচের নিরবতা
এমবাপ্পেকে নিয়ে এত বড় বিতর্ক চললেও রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাব কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করেনি। ক্লাবের পক্ষ থেকে এটি স্পষ্ট করা হয়নি যে, ছুটিতে যাওয়া এমবাপ্পের শারীরিক পুনর্বাসনে কোনো বিঘ্ন ঘটিয়েছে কি না। রিয়ালের বর্তমান কোচ আলভারো আরবেলোয়া সংবাদ সম্মেলনে এ প্রসঙ্গে কিছুটা কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘খেলোয়াড়দের চোটের বিষয়টি পুরোপুরি মেডিকেল টিম তদারকি করে। তবে খেলোয়াড়রা তাঁদের ব্যক্তিগত অবসরে কী করবেন বা কোথায় যাবেন, তা একান্তই তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়।’
উল্লেখ্য যে, ২০২৯ সাল পর্যন্ত রিয়ালের সঙ্গে এমবাপ্পের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি থাকায় আইনি ও আর্থিক কারণে তাঁকে দল থেকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা বিশ্লেষকদের মতে নেই বললেই চলে।
এল ক্লাসিকো ও ভবিষ্যৎ গন্তব্য
আগামী রবিবার ফুটবল বিশ্বের অন্যতম হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ ‘এল ক্লাসিকো’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই ম্যাচে এমবাপ্পের মাঠে নামার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। যদি এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদ পরাজিত হয় এবং এমবাপ্পে পারফর্ম করতে ব্যর্থ হন, তবে বিতর্কের এই আগ্নেয়গিরি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, জাতীয় দলের ক্ষেত্রে এমবাপ্পে এখনো অপরিহার্য। ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে তিনি তাঁর স্বাভাবিক ছন্দে খেলবেন বলে আশা করা হচ্ছে। রিয়াল মাদ্রিদে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে কেবল গোলের পর গোল করা নয়, বরং মাঠের বাইরের শৃঙ্খলা ও সতীর্থদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই এখন এমবাপ্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রিয়াল সমর্থকদের এই বিপুল পরিমাণ স্বাক্ষর তাঁর জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
