২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ ও ফুটবল ফেডারেশনের শর্তাবলি

ক্রীড়া ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আয়োজক দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে যে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটেছে। টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র এক মাস আগে ইরান ফুটবল ফেডারেশন (এফএফআইআর) আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বিশ্বমঞ্চে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ শক্তি হিসেবে ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।

ইরান ফুটবল ফেডারেশনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান

ইরান ফুটবল ফেডারেশন তাদের দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, তারা মাঠের লড়াইয়ে যোগ্যতা অর্জন করে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে। বিবৃতিতে ফেডারেশন উল্লেখ করে, “আমরা অবশ্যই ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেব। তবে আমাদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও আদর্শিক অবস্থান থেকে একচুলও সরে না এসে আমরা এই বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করব। কোনো বহিঃশক্তি ইরানকে এই বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট থেকে বঞ্চিত করার অধিকার রাখে না।” একই সঙ্গে তারা আয়োজক দেশগুলোকে ইরানের দেওয়া শর্তসমূহ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।

মেহদি তাজের ১০ দফা শর্ত ও নিরাপত্তা দাবি

ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ সম্প্রতি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের বিপরীতে ১০টি সুনির্দিষ্ট শর্তের কথা তুলে ধরেছেন। এই শর্তগুলোর মূল লক্ষ্য হলো ইরানি খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের জন্য একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ এবং সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • অবাধ ভিসা প্রক্রিয়া: জাতীয় দলের সকল খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং কর্মকর্তাদের জন্য কোনো প্রকার প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই ভিসা প্রদান নিশ্চিত করা।

  • জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা: ফিফার প্রতিটি দাপ্তরিক কার্যক্রমে এবং স্টেডিয়ামে ইরানের জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতের পূর্ণ মর্যাদা বজায় রাখা।

  • নিরাপত্তা ব্যবস্থা: বিমানবন্দর থেকে শুরু করে হোটেল এবং অনুশীলনের মাঠ পর্যন্ত যাতায়াতের পথে সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা প্রদান করা।

মেহদি তাজ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, যেসব খেলোয়াড় বা কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)-এর অধীনে সম্পন্ন করেছেন—যেমন তারকা ফুটবলার মেহদি তারেমি ও এহসান হাজসাফি—তাদের ভিসার ক্ষেত্রে যেন কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার অজুহাত না দেখানো হয়।

কূটনৈতিক জটিলতা ও ভিসা সংক্রান্ত বিতর্ক

ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে শঙ্কা জোরালো হয় যখন গত মাসে ফিফা কংগ্রেসে যোগ দিতে চাওয়া মেহদি তাজকে কানাডায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কানাডা সরকার ২০২৪ সালে আইআরজিসি-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করায় এবং মেহদি তাজের সঙ্গে ওই বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এই পদক্ষেপ নেয়।

অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন যে, ইরানি ফুটবলারদের যুক্তরাষ্ট্রে স্বাগত জানানো হবে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আইআরজিসির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকতে পারে। এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানের প্রেক্ষিতে ইরান ফুটবল ফেডারেশন তাদের খেলোয়াড় ও কারিগরি দলের পূর্ণ নিরাপত্তার ব্যাপারে অনড় অবস্থানে রয়েছে।

ফিফার হস্তক্ষেপ ও গ্রুপ পর্বের সূচি

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ইরান তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্রেই খেলবে। খেলোয়াড়দের ভিসা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফিফা আয়োজক দেশগুলোর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ বিন্যাসে ইরান গ্রুপ ‘জি’-তে স্থান পেয়েছে। এই গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম ও মিসর। আগামী ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ইরানের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

ফুটবল ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

ইরানের অংশগ্রহণ কেবল তাদের ভক্তদের জন্যই নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের নান্দনিকতা ও প্রতিযোগিতার ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বৈরিতা ছাপিয়ে ক্রীড়াঙ্গনের আদর্শ বজায় রাখাই এখন ফিফা ও আয়োজক দেশগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ। ইরানের ফুটবল ফেডারেশন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের দেওয়া শর্তসমূহ যথাযথভাবে পূরণ হওয়া সাপেক্ষে তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সেরা নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে প্রস্তুত। যথাযথ ভিসা প্রক্রিয়া এবং খেলোয়াড়দের জন্য সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই বৈশ্বিক মিলনমেলার সার্থকতা বজায় থাকবে।

Leave a Comment