ভারত ও চীনের ফুটবল বাজারে বড় ধাক্কা: বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে দোটানায় ফিফা

আগামী ১১ জুন উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় পর্দা উঠতে যাচ্ছে ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’-এর। ফুটবলের এই মহোৎসব ঘিরে বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা থাকলেও বিশ্বের দুই বৃহত্তম বাজার ভারত ও চীনে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। টুর্নামেন্ট শুরু হতে মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকলেও এখন পর্যন্ত দেশ দুটির কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্প্রচার চুক্তি সম্পন্ন করতে পারেনি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। এর ফলে কয়েকশ কোটি ফুটবল অনুরাগীর সরাসরি খেলা দেখা নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।


ভারতের বাজারে ফিফার অনড় অবস্থান ও ডিজনির প্রস্তাব

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের বিশাল বাজারে সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির বিষয়টি বর্তমানে এক জটিল মারপ্যাঁচে আটকে আছে। সম্প্রতি ভারতে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এবং দ্য ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানি তাদের মিডিয়া ব্যবসা একীভূত করার ঘোষণা দিয়েছে। এই নতুন শক্তিশালী জোট ফিফাকে ২০২৬ বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্বের বিনিময়ে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা) প্রদানের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছিল।

তবে ফিফা এই প্রস্তাবিত অর্থকে তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং ভারতীয় বাজারের গুরুত্বের তুলনায় ‘অপ্রতুল’ বলে বিবেচনা করেছে। ফিফার প্রত্যাশা অনুযায়ী আর্থিক অঙ্ক না মেলায় তারা এই প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, সনি গ্রুপ কর্পোরেশন যারা দীর্ঘকাল ধরে ভারতে ক্রীড়া সম্প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, তারা ফিফার সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা চালালেও শেষ পর্যন্ত কোনো আর্থিক প্রস্তাব (বিড) জমা দেয়নি। ফিফা ইতিমধ্যে বিশ্বের ১৭৫টিরও বেশি অঞ্চলে তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম চূড়ান্ত করলেও ভারত ও চীনের মতো দুটি বড় বাজার তালিকার বাইরে থাকা তাদের বাণিজ্যিক কৌশলের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।


চীনের নীরবতা: অতীতের ধারাবাহিকতায় ছেদ

চীনের প্রেক্ষাপট ভারতের চেয়েও কিছুটা বেশি বিস্ময়কর। ঐতিহ্যগতভাবে চীন ফুটবল বিশ্বকাপের একটি বড় ভোক্তা। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন’ (সিসিটিভি) সাধারণত বিশ্বকাপের অনেক আগেই তাদের সম্প্রচার স্বত্ব নিশ্চিত করে প্রচারণার ঢোল বাজাতে শুরু করে। ২০১৮ সালের রাশিয়া এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় এর ব্যতিক্রম হয়নি।

কিন্তু ২০২৬ সালের আসর নিয়ে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া মেলেনি। চীনের কোনো স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বা সিসিটিভি এখনও ফিফার শর্ত মেনে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। ফলে দেশটির ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও স্যাটেলাইট চ্যানেলে খেলা দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে নজিরবিহীন ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।


বাজার বিশ্লেষণ ও বৈশ্বিক প্রভাবের পরিসংখ্যান

ফিফার কাছে ভারত ও চীনের গুরুত্ব কেবল দর্শক সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ডিজিটাল প্রবৃদ্ধির ওপরও নির্ভরশীল। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের দর্শক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বৈশ্বিক সম্প্রচার বাণিজ্যে এই দুই দেশের প্রভাব কতটা ব্যাপক ছিল:

মাধ্যমচীনের দর্শক অংশ (%)ভারতের দর্শক অংশ (%)সম্মিলিত বৈশ্বিক প্রভাব (%)
টেলিভিশন (TV)১৭.৭%২.৯%২০.৬%
ডিজিটাল স্ট্রিমিং২২.৬%

তথ্যমতে, ২০২২ সালে বৈশ্বিক ডিজিটাল স্ট্রিমিংয়ের প্রায় ২২.৬ শতাংশ দর্শক ছিল এই দুই দেশ থেকে। যদি শেষ পর্যন্ত চুক্তি না হয়, তবে ফিফা তাদের মোট স্ট্রিমিং অডিয়েন্সের প্রায় এক-চতুর্থাংশ হারাবে, যা তাদের বিজ্ঞাপন ও স্পনসরশিপ আয়ে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে।


চুক্তি সম্পাদনে ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক বাধা

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ভারত ও চীনের জন্য একটি বড় প্রতিকূলতা। এর পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করছে:

  • সময়ের বিশাল ব্যবধান: ম্যাচগুলো উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভারত ও চীনের স্থানীয় সময় অনুযায়ী তা মধ্যরাত কিংবা ভোররাতে সম্প্রচারিত হবে। এশিয়ান দর্শকদের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত প্রতিকূল, যা সরাসরি টেলিভিশন রেটিং (TRP) কমিয়ে দিতে পারে।

  • বিজ্ঞাপনী বাজারের অনাগ্রহ: ভারতে ক্রিকেটের তুলনায় ফুটবলের বাজার এখনও সীমিত। গভীর রাতের ম্যাচে দর্শক কম হওয়ার আশঙ্কায় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো চড়া মূল্যে বিজ্ঞাপনের স্লট কিনতে দ্বিধাবোধ করছে।

  • প্রস্তুতির সময়সীমা: ১১ জুনের আগে এখন যদি চুক্তি সই হয়ও, তবে এত কম সময়ের মধ্যে কারিগরি পরিকাঠামো প্রস্তুত করা, গ্রাফিকস সেটআপ এবং বাণিজ্যিক স্লট বরাদ্দ করা সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।


দাবার অন্তিম চাল: কোন দিকে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ?

বিজ্ঞাপন ও বিপণন সংস্থা ডেন্টসু ইন্ডিয়ার স্পোর্টস পার্টনার রোহিত পোতফোদের মতে, এই পরিস্থিতিকে এখনই ‘অচলাবস্থা’ বলা ঠিক হবে না। তিনি একে একটি জটিল দাবার ছকের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে ফিফা এবং ব্রডকাস্টার উভয় পক্ষই একে অপরের শেষ চাল দেখার অপেক্ষায় রয়েছে। ফিফা কি তাদের আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কমিয়ে কোটি কোটি দর্শককে খেলার সুযোগ দেবে, নাকি এশিয়ার এই দুই জায়ান্ট বাজার ছাড়াই বিশ্বকাপ শুরু হবে—তা দেখার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে অনিশ্চয়তার মেঘ না কাটলে এই মহোৎসব কয়েকশ কোটি মানুষের কাছে কেবল ডিজিটাল খবরের শিরোনাম হয়েই থেকে যেতে পারে।

Leave a Comment