মেসির জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিন

লিওনেল মেসির নামের পাশে আজ ‘সম্পূর্ণতা’ শব্দটি মানানসই। ক্লাব ফুটবলে প্রায় সব সম্ভাব্য শিরোপা জেতা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার মতো শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন—সব মিলিয়ে তিনি সময়ের অন্যতম সেরা ফুটবলার। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালেও আছে এক গভীর অন্ধকার অধ্যায়, যা দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল। এমন এক সময় এসেছিল, যখন ব্যর্থতার ভারে নুয়ে পড়ে মেসির মনে হয়েছিল—তিনি আর বাঁচতেই চান না।

আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় স্ট্রিমিং চ্যানেল লুজু টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেসি নিজেই সেই অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল কিছুদিন আগে, তবে সম্প্রতি তা প্রকাশ্যে আসে। মেসি ফিরে গেছেন ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। মেসি নিজেও পেনাল্টি মিস করেন। টানা দ্বিতীয়বার কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের সেই রাত ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ভারী মুহূর্ত।

মেসির ভাষায়, “আমি প্রচণ্ড অনুশোচনায় ভুগছিলাম। সত্যি বলতে, তখন মরে যেতে ইচ্ছা হয়েছিল।” জাতীয় দলের হয়ে শিরোপাহীন থাকার কারণে সমালোচনা তখন চরমে। সংবাদমাধ্যম, সমর্থক—সব জায়গা থেকেই প্রশ্ন উঠছিল, ক্লাব পর্যায়ে এত সাফল্য অথচ জাতীয় দলে কেন নয়? সেই মানসিক চাপ থেকেই মেসি আচমকাই আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন।

কিন্তু সময়ই শেষ কথা বলে। কয়েক মাস পর নিজের ভেতরের তাগিদে এবং ফুটবলের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে মেসি অবসর ভেঙে ফিরে আসেন। এরপর তাঁর নেতৃত্বেই বদলে যায় ইতিহাস। আর্জেন্টিনার শিরোপাখরা অধ্যায়ের অবসান ঘটে, আর সমালোচনা রূপ নেয় শ্রদ্ধায়।

মেসির জাতীয় দলের বড় সাফল্যসমূহ :

বছরটুর্নামেন্টঅর্জন
২০২১কোপা আমেরিকাচ্যাম্পিয়ন
২০২২ফিনালিসিমাচ্যাম্পিয়ন
২০২২ফিফা বিশ্বকাপচ্যাম্পিয়ন

এই অর্জনগুলো শুধু ট্রফি নয়, মেসির মানসিক পুনর্জন্মেরও প্রতীক। নিজ দর্শনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “পড়ে গেলে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। চেষ্টা না করলে কখনো জানা যায় না, আপনি কতদূর যেতে পারতেন।”

মেসির জীবনেও এই দর্শন সত্য প্রমাণিত হয়েছে। শৈশবের হরমোনজনিত সমস্যা, বারবার সমালোচনা, আন্তর্জাতিক ব্যর্থতা—কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। আজ ৩৮ বছর বয়সেও তিনি মাঠে সক্রিয়, ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলছেন এবং অন্তত ২০২৮ এমএলএস মৌসুম পর্যন্ত তাঁর খেলা নিশ্চিত।

তবে খেলা ছাড়ার পরের জীবন নিয়েও ভাবনা আছে। কোচিং নয়, বরং ক্লাব গড়ে তোলাই তাঁর স্বপ্ন। ইতিমধ্যে বন্ধু লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে উরুগুয়ের চতুর্থ বিভাগে দেপোর্তিভো এলএসএম নামে একটি ক্লাবের সহ-মালিক হয়েছেন মেসি। প্রায় শূন্য থেকে গড়া এই ক্লাবে রয়েছে হাজারো সদস্য ও পেশাদার কর্মী। শিশুদের ফুটবলে গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।

মেসির গল্প তাই শুধু সাফল্যের নয়, ভেঙে পড়েও ঘুরে দাঁড়ানোর। অন্ধকারের ভেতর দিয়েই যে আলোতে পৌঁছাতে হয়—লিওনেল মেসির জীবন তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।

Leave a Comment