বাফুফের কোচ অনুসন্ধান: তিন দিনের চূড়ান্ত সময়সীমায় দেশের ফুটবল ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচের শূন্য পদ পূরণে চলমান দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) জাতীয় দল কমিটির পক্ষ থেকে দেওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে, আগামী তিন দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত করা হবে নতুন কোচের নাম। সাবেক কোচ হাভিয়ের কাবরেরার বিদায়ের পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণে বিশ্বব্যাপী কয়েক স্তরের নিবিড় যাচাই-বাছাই ও কারিগরি মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এখন তার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।


নিয়োগ প্রক্রিয়ার নেপথ্য ও সংক্ষিপ্ত তালিকা

সোমবার বিকেলে রাজধানীর বেরাইদস্থ ফর্টিস গ্রাউন্ডে বাফুফের জাতীয় দল কমিটির একটি নীতিনির্ধারণী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে কমিটির অন্যতম সদস্য আমিরুল ইসলাম বাবু গণমাধ্যমের কাছে কোচের বর্তমান অবস্থা ও বাফুফের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, কাবরেরার ৪ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন অভিভাবক খুঁজতে গিয়ে বাফুফে অভাবনীয় সাড়া পেয়েছে।

গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত আবেদনের সময়সীমার মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ জন পেশাদার কোচ বাংলাদেশের দায়িত্ব নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই বিপুল সংখ্যক আবেদনপত্র থেকে প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ২২ জনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। সোমবারের চূড়ান্ত পর্যালোচনায় সেই তালিকাকে আরও সংকুচিত করে মাত্র ১০ জনে নামিয়ে আনা হয়েছে। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরবর্তী তিন দিন এই শীর্ষ ১০ জন প্রার্থীর সাথে নিবিড়ভাবে সাক্ষাৎকার (ইন্টারভিউ) গ্রহণ করা হবে এবং তাদের পরিকল্পনা বিচার-বিশ্লেষণ করে সেরা একজনকে দায়িত্ব প্রদান করা হবে।


বাফুফের নির্ধারিত কারিগরি মানদণ্ড

একটি মানসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদী কোচিং প্যানেল গঠনের লক্ষ্যে বাফুফে এবার যোগ্যতার ক্ষেত্রে কোনো শিথিলতা প্রদর্শন করছে না। আমিরুল ইসলাম বাবুর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন কোচ নির্বাচনে তিনটি মূল বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে:

  • পেশাদার সনদ (প্রো-লাইসেন্স): নিয়োগযোগ্য প্রার্থীকে অবশ্যই ফিফা বা স্বীকৃত মহাদেশীয় কনফেডারেশন (যেমন এএফসি বা উয়েফা) থেকে ‘প্রো-লাইসেন্স’ প্রাপ্ত হতে হবে।

  • কাজের অভিজ্ঞতা: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দল পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় ফুটবলের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

  • আধুনিক ফুটবল দর্শন: আধুনিক ফুটবলের দ্রুত পরিবর্তনশীল রণকৌশল এবং হাই-ইনটেনসিটি গেমপ্ল্যানের সাথে দলকে মানিয়ে নেওয়ার টেকনিক্যাল সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে।

এছাড়া, প্রধান কোচের সহযোগী প্যানেল (গোলকিপিং ও ফিটনেস কোচ) নিয়োগের ক্ষেত্রেও বাফুফে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। ফেডারেশন প্রথমে প্রধান কোচ চূড়ান্ত করবে। এরপর সেই কোচের ব্যক্তিগত পছন্দ বা নিজস্ব কোনো বিশ্বস্ত প্যানেল থাকলে, তাকেই গুরুত্ব দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোচিং স্টাফ গঠন করা হবে।


জুনের চ্যালেঞ্জ: একই সাথে দুই ফ্রন্টে লড়াই

আসন্ন জুন মাসটি বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষার সময়। একই সময়ে দুটি ভিন্ন আন্তর্জাতিক ইভেন্ট থাকায় নতুন কোচের জন্য দল গোছানো হবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

১. মালদ্বীপ চার জাতি টুর্নামেন্ট: জুনে মালদ্বীপে অনুষ্ঠিতব্য এই টুর্নামেন্টে স্বাগতিকদের বিশেষ অনুরোধে বাফুফে অনূর্ধ্ব-২৩ দলের পরিবর্তে জাতীয় দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২. সান মারিনো প্রীতি ম্যাচ: মালদ্বীপ মিশনের সমসাময়িক সময়েই ইউরোপের সান মারিনোর বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে বাংলাদেশের।

একই সময়ে দুটি আলাদা গন্তব্যে ম্যাচ থাকায় বাফুফেকে পৃথক দুটি শক্তিশালী জাতীয় দল গঠন করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন কোচের দ্রুত যোগদান এবং খেলোয়াড়দের মানসিক ও কৌশলগতভাবে প্রস্তুত করা একটি বিশাল প্রশাসনিক ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।


ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা ও বাফুফের লক্ষ্য

জাতীয় দল কমিটির সদস্য আমিরুল ইসলাম বাবু আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “পরপর তিন দিন আমরা এই ১০ জনের সঙ্গে কথা বলব এবং আলোচনা শেষে একজনকে চূড়ান্ত করব।” বাফুফের এই দ্রুত তৎপরতা নির্দেশ করে যে, তারা জুনের ব্যস্ত সূচির আগেই নতুন কোচকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে চায়।

হাভিয়ের কাবরেরার বিদায়ের পর বর্তমানে অভিভাবকহীন থাকা জাতীয় দলের জন্য নতুন কোচের প্রধান লক্ষ্য হবে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করা। জুনের প্রীতি ম্যাচ ও চার জাতি টুর্নামেন্টই হবে নতুন কোচের প্রথম বড় অ্যাসাইনমেন্ট। ফুটবল সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আধুনিক ফুটবল দর্শনে বিশ্বাসী এবং অভিজ্ঞ কোনো অভিভাবকই শেষ পর্যন্ত জামাল ভূঁইয়া ও হামজা চৌধুরীদের নতুন কান্ডারি হিসেবে নিযুক্ত হবেন। আগামী তিন দিনের মধ্যেই দেশের ফুটবল অঙ্গনে এই বহু প্রতীক্ষিত ঘোষণাটি আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

Leave a Comment