চলতি বিশ্বকাপে মাঠের তীব্র লড়াইকে ছাপিয়ে এবার বড় ধরনের মাঠের বাইরের বিতর্ক ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। ফিফার ‘লাল কার্ড’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে চলা তুমুল আলোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সম্পূর্ণ নতুন এক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং প্যারাগুয়ের প্রভাবশালী সিনেটর সেলেস্তে আমারিয়া। দুই দেশের এই দুই শীর্ষ ব্যক্তিত্বের মধ্যকার তীব্র বাকযুদ্ধ এখন ক্রীড়াঙ্গন ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের রূপ নিতে যাচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত ফ্রান্সের কাছে প্যারাগুয়ের ১-০ গোলে হেরে যাওয়ার পর। ম্যাচের পর পরই নিজের ক্ষোভ সামলাতে না পেরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এমবাপ্পেকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত বিতর্কিত ও আক্রমণাত্মক কিছু মন্তব্য করেন সিনেটর আমারিয়া। তিনি ফরাসি অধিনায়ককে ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতার ক্যামেরুনীয়’, ‘ফরাসি হওয়ার ভান করা অহংকারী’ এবং সরাসরি ‘কুৎসিত’ বলে আখ্যায়িত করেন। এমন তীব্র বর্ণবাদী ও আপত্তিকর মন্তব্যের পর চারদিকে তুমুল সমালোচনা শুরু হলে তিনি পোস্টটি মুছে ফেলেন। তবে এমবাপ্পে এর তীব্র পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখানোর পর সিনেটর আমারিয়া পিছু হটেননি, বরং এবার সরাসরি একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন।
নতুন এই খোলা চিঠিতে আমারিয়া নিজের ভুল বা দোষ স্বীকার করলেও একই সঙ্গে এমবাপ্পের ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টি করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তার এই ক্ষোভ বা বিরোধ পুরো ফ্রান্স দলের বিরুদ্ধে নয়, এটি নিছকই এমবাপ্পের ব্যক্তিগত আচরণের বিরুদ্ধে। তবে এর জন্য এমবাপ্পেকেও প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে বলে তিনি দাবি তুলেছেন।
ম্যাচের আগে ও পরে আচরণের গুরুতর অভিযোগ
সিনেটর আমারিয়ার অভিযোগ কেবল মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ নয়, ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই এমবাপ্পে প্যারাগুয়ে দলকে খাটো করে দেখছিলেন। আমারিয়ার দাবি, ম্যাচের আগেই এমবাপ্পে হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি নোংরা খেলতে হয়, তাহলে নোংরাই খেলব।’ এই ধরনের মন্তব্য করে ফরাসি তারকা প্যারাগুয়ের পুরো ফুটবল ঐতিহ্য ও দলকে চরমভাবে অপমান করেছেন বলে মনে করেন এই সিনেটর।
এখানেই শেষ নয়, ম্যাচ চলাকালীনও এমবাপ্পে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের প্রতি চরম অবজ্ঞাসূচক আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সিনেটরের ভাষ্য অনুযায়ী, এমবাপ্পে খেলা চলাকালে এক পর্যায়ে প্যারাগুয়ের ফুটবলারদের লক্ষ্য করে স্প্যানিশ ভাষায় সরাসরি অশালীন গালিগালাজও করেছেন।
ম্যাচ শেষের একটি ঘটনা আমারিয়াকে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ করেছে। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর ফরাসি অধিনায়ক মাঠের সৌজন্যতা ভুলে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের সঙ্গে করমর্দন পর্যন্ত করেননি। প্রতিপক্ষকে এড়িয়ে গিয়ে তিনি কেবল নিজের দলের জয় উদযাপনেই মত্ত ছিলেন। এই আচরণকে স্পোর্টসম্যানশিপের পরিপন্থী উল্লেখ করে আমারিয়া চিঠিতে লিখেছেন, “প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি সম্মান দেখানো খেলাধুলার অন্যতম মৌলিক মূল্যবোধ। জয় কিংবা পরাজয়—পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, মাঠের সেই সৌজন্য ও সম্মান বজায় রাখা ফুটবলারদের দায়িত্ব। কিন্তু তুমি অহংকারবশত সেটি করোনি।”
নিজের ভুলের স্বীকারোক্তি ও আইনি ব্যবস্থার হুমকি
খোলা চিঠিতে অবশ্য নিজের করা প্রথম টুইটের বর্ণবাদী মন্তব্যের জন্য কিছুটা অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন আমারিয়া। তিনি স্বীকার করেছেন যে, হারের পর রাগের মাথায় তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং এমবাপ্পেকে উদ্দেশ্য করে অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সেই পোস্টটি সরিয়ে নেন। নিজের এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “আমি পরবর্তীতে বুঝতে পেরেছি, রাগের মাথায় আমি আসলে সেই একই বর্ণবাদী ঘৃণার পুনরাবৃত্তি করছিলাম, যার শিকার অনেক সময় আমাদেরও হতে হয়। আর এই অনুভূতির কারণেই আমি পোস্টটি মুছে ফেলেছি।”
তবে নিজের ভুল স্বীকার করলেও এমবাপ্পের মন্তব্য বা আচরণকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে রাজি নন এই প্যারাগুয়েন সিনেটর। এমবাপ্পে তার প্রতিক্রিয়ায় এই সিনেটরকে ‘নিকৃষ্ট’ বা ‘এই পদে থাকার অযোগ্য’ বলে যে মন্তব্য করেছিলেন, তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন আমারিয়া। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাকে এই ধরনের কথা বলার কোনো অধিকার তোমার নেই। আমি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত একজন সিনেটর।”
চিঠির শেষাংশে আমারিয়া অভিযোগের আঙুল তুলে বলেন, এমবাপ্পে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতামূলক (জেন্ডার-বেসড ভায়োলেন্স) মন্তব্য করেছেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফরাসি ফরোয়ার্ড যদি অনতিবিলম্বে নিজের করা মন্তব্য প্রত্যাহার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা না চান, তবে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে চূড়ান্ত হুমকি দিয়েছেন তিনি। বিশ্বমঞ্চের এই হাইপ্রোফাইল বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
