প্রকৃতির চরম বৈরী আবহাওয়া, প্রবল বৃষ্টি আর অনবরত বজ্রঝড়ের কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ম্যাচ শুরু হতে দেরি হয়েছিল ১ ঘণ্টা। তবে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার মেক্সিকান সমর্থকের উন্মাদনা ও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র ভাটা ফেলতে পারেনি এই দুর্যোগ। ঘরের মাঠের সেই গগনবিদারি গর্জন আর গ্যালারি মাতানো করতালিতে ভর করেই শেষ পর্যন্ত ফুটবলের নতুন এক ইতিহাস গড়ল মেক্সিকো। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে টুর্নামেন্টের অন্যতম সহ-আয়োজকরা।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো ম্যাচ জেতার স্বাদ পেল মেক্সিকানরা। এর আগে সর্বশেষ ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ঘরের মাটিতেই নকআউট পর্বের ম্যাচ জিতেছিল তারা। চার দশক পর আবারও ঘরের মাঠেই সেই গৌরব ও আবেগের পুনরাবৃত্তি ঘটল।
মাঠের লড়াই ও মেক্সিকোর আধিপত্য
ম্যাচ শুরুর আগে মাঠের আবহাওয়া নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও রেফারি বাঁশি বাজানোর সাথে সাথেই মাঠের লড়াই রূপ নেয় চরম উত্তেজনায়। মেক্সিকোর ফুটবলাররা শুরু থেকেই হাই-প্রেসিং ফুটবল খেলে লাতিন আমেরিকার শক্তিশালী দল ইকুয়েডরকে চেপে ধরে। ঘরের মাঠের দর্শকদের জোরালো সমর্থনে উজ্জীবিত হয়ে মেক্সিকান ফরোয়ার্ডরা একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে ইকুয়েডরের রক্ষণভাগে।
ম্যাচের প্রথমার্ধেই দারুণ এক গুছানো আক্রমণ থেকে প্রথম গোলের দেখা পায় মেক্সিকো। গোল হজম করার পর সমতায় ফিরতে মরিয়া ইকুয়েডর বেশ কিছু পাল্টা আক্রমণ চালালেও মেক্সিকোর জমাট ডিফেন্স এবং গোলরক্ষকের দুর্দান্ত কিছু সেভের কারণে গোল করতে ব্যর্থ হয়। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে মেক্সিকো তাদের আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেয় এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে ইকুয়েডরের ডি-বক্সের ভেতর সৃষ্টি হওয়া জটলা কাজে লাগিয়ে মেক্সিকান স্ট্রাইকার দলের হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ইকুয়েডর ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় এবং বাকি সময় মেক্সিকো পেশাদারিত্বের সাথে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রেখে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে।
৪০ বছরের খরা এবং ঐতিহাসিক ১৯৮৬ সালের স্মৃতি
মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসে এই জয়টি একটি বিশেষ মাইলফলক। ফুটবল বিশ্বে মেক্সিকো অন্যতম জনপ্রিয় দল হলেও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে বা শেষ ষোলোর বৈতরণী পার হওয়া তাদের জন্য বরাবরই একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বাধা ছিল। ১৯৮৬ সালে যখন মেক্সিকো এককভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল, তখন তারা নকআউট ম্যাচে বুলগেরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল।
এরপর দীর্ঘ ৪০ বছর কেটে গেছে, মেক্সিকো প্রতিটি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব পার করলেও নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচেই হেরে বিদায় নিয়েছে, যা ফুটবল বিশ্বে ‘নকআউট অভিশাপ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। ২০২৬ সালে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সাথে যৌথ আয়োজক হিসেবে মেক্সিকো সেই পুরোনো ইতিহাস বদলে দিল। ঘরের মাঠের দর্শকদের সামনে দীর্ঘ চার দশকের খরা কাটিয়ে ঐতিহাসিক এই জয় ডাচ কিংবা লাতিন পরাশক্তিদের মতোই মেক্সিকোর ফুটবলকে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের চূড়ায় নিয়ে গেল। শেষ ষোলোতে মেক্সিকোর পরবর্তী প্রতিপক্ষ কে হবে, তা নিয়ে এখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
