ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কানাডা সকার (Canada Soccer) তাদের দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বাণিজ্যিক অংশীদার ‘কানাডিয়ান সকার বিজনেস’ (CSB)-এর সাথে চুক্তির মেয়াদ আরও ১১ বছর বৃদ্ধি করেছে। এই নতুন চুক্তিটি ২০৩৭ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে এবং উভয় পক্ষের সম্মতিতে আরও ৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কলহ, খেলোয়াড়দের ধর্মঘট এবং আইনি লড়াইয়ের পর এই সংস্কারকৃত চুক্তিটি কানাডার ফুটবল অঙ্গনে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
চুক্তির পটভূমি ও ঐতিহাসিক সংকট
কানাডা সকারের সাথে এই বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের শুরু থেকেই তীব্র সমালোচনা ছিল। ২০১৩ সালে সংসদীয় তদন্তে দেখা যায় যে, এই ফেডারেশন তাদের বাণিজ্যিক ও সম্প্রচার স্বত্ব থেকে বার্ষিক মাত্র ৩ মিলিয়ন ডলার পেত, যা জাতীয় দলগুলোর যথাযথ অর্থায়নের জন্য অত্যন্ত অপর্যাপ্ত ছিল। এই আর্থিক সংকটের জেরে ২০২২ সালে পানামার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ বয়কট করেছিল কানাডার পুরুষ দল। তাদের মূল দাবি ছিল বিশ্বকাপের প্রাইজমানির সুষম বণ্টন এবং নারী দলের সমান ম্যাচ ফি নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, টোকিও অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়ী কানাডার শক্তিশালী নারী দলও চরম অর্থকষ্টে ভুগছিল। ২০২৩ সালে ‘শি-বিলিভস কাপ’-এর প্রস্তুতি ক্যাম্পে মাত্র ২০ জন খেলোয়াড়কে আমন্ত্রণ জানানো হলে দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। খেলোয়াড়দের ইউনিয়ন সাবেক বোর্ড সদস্যদের বিরুদ্ধে ৪০ মিলিয়ন ডলারের মামলাও দায়ের করেছিল।
নিচে পুরনো ও নতুন চুক্তির প্রধান পার্থক্যসমূহ তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | পুরনো চুক্তি (CSB) | নতুন চুক্তি (CSME) |
| মেয়াদ | ১০ বছর | ১১ বছর (২০৩৭ পর্যন্ত) |
| বার্ষিক আয় | প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন ডলার | উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি (গোপন রাখা হয়েছে) |
| রাজস্ব মডেল | নির্দিষ্ট ফি ভিত্তিক | নতুন রেভিনিউ-শেয়ারিং মডেল |
| সম্প্রচার নীতি | সীমিত প্রচার | নারী ও পুরুষ দলের সম-অধিকার নিশ্চিত |
| পর্যালোচনা | নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না | প্রতি ৩ বছর অন্তর বাজার দর যাচাই |
সংস্কারকৃত চুক্তির বিশেষ বৈশিষ্ট্য
নতুন চুক্তির অধীনে ‘কানাডিয়ান সকার বিজনেস’ (CSB)-কে এখন ‘কানাডিয়ান সকার মিডিয়া অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট’ (CSME) হিসেবে নতুন করে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে। ফুটবল অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধান নির্বাহী জেমস জনসন এবং কানাডা সকারের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কেভিন ব্লু এই নতুন কাঠামোর রূপকার।
১. রাজস্ব ভাগাভাগি: এবারের চুক্তিতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘রেভিনিউ-শেয়ারিং’ বা লভ্যাংশ ভাগাভাগির মডেল চালু করা হয়েছে, যা আগে ছিল না। এর ফলে কানাডা সকারের আয় ভবিষ্যতে বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে।
২. সম্প্রচার সমতা: নতুন সম্প্রচার চুক্তিতে পুরুষ ও নারী দলের সকল ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচারের পাশাপাশি প্রচারের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ‘কানাডা-বান্ধব সময় অঞ্চলে’ ম্যাচগুলো টেলিভিশন পর্দায় সরাসরি প্রদর্শিত হবে।
৩. নমনীয়তা: প্রতি তিন বছর অন্তর চুক্তির শর্তাবলী পর্যালোচনা করা হবে যাতে বাজারের সঠিক মূল্যায়ন বজায় থাকে এবং খেলোয়াড়দের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়।
নেতৃত্বের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
কানাডা সকারের প্রধান নির্বাহী কেভিন ব্লু এই চুক্তিকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, “আমরা এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি যা কানাডা সকারের জন্য অনেক বেশি অনুকূল। এটি আমাদের বাণিজ্যিক ও আর্থিক সাফল্যের একটি পরিষ্কার পথ তৈরি করেছে, বিশেষ করে বিশ্বকাপের এই সন্ধিক্ষণে।”
আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে কানাডার সামনে এখন বড় সুযোগ। খেলোয়াড় এবং ফেডারেশনের মধ্যে দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্ক এই চুক্তির মাধ্যমে উষ্ণ হবে বলে ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আর্থিক স্বচ্ছতা এবং খেলোয়াড়দের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা গেলে কানাডার ফুটবল বিশ্বমঞ্চে আরও বড় সাফল্য অর্জন করবে—এটাই এখন সাধারণ সমর্থকদের প্রত্যাশা।
