
কোচের সঙ্গে বিরোধের জেরে পর্তুগালের ক্যাম্প ছেড়ে গেলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো
ইউরোপিয়ান ফুটবলের আঙিনায় এক অপ্রত্যাশিত এবং চাঞ্চল্যকর ঘটনার জন্ম দিয়ে পর্তুগালের জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেছেন মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। উয়েফা নেশনস লিগে ডেনমার্কের বিপক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তার এই হঠাৎ বিদায় ফুটবল বিশ্বে নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। কোচের সঙ্গে তৈরি হওয়া মতপার্থক্য এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তের টানাপোড়েনের পর তিনি এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভেরিফাইড অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জাতীয় শিবির ত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং নিজের বিদায়ী বক্তব্যে এক ধরণের অভিমানের সুর ফুটিয়ে তুলেছেন। ব্যক্তিগত বিমানে মাদ্রিদের উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রাক্কালে তিনি ভক্তদের উদ্দেশ্যে এই বার্তাটি প্রদান করেন।
নিজের প্রকাশিত বিবৃতিতে পর্তুগিজ অধিনায়ক লিখেছেন, জাতীয় দলের কোচের আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পর এবং পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেই তিনি ক্যাম্প ছেড়ে চলে আসার এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, যে দেশের জার্সির জন্য তিনি আজীবন নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন এবং সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সেই জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে হঠাৎ তাকে কেন এভাবে বিদায় নিতে হলো, তার পেছনের সম্পূর্ণ সত্য ঘটনাটি তিনি যথাসময়ে পর্তুগালের প্রতিটি মানুষকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেবেন। বিবৃতির শেষ অংশে তিনি বর্তমান দল এবং তার সব সতীর্থকে কোনো ধরনের রাখঢাক না রেখেই আন্তরিক শুভকামনা জানিয়েছেন।
এই নাটকীয় ঘটনার পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে গত কয়েকদিন ধরে চলা অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন। মূলত ডেনমার্ক ম্যাচের আগে টানা তিন দিন পর্তুগালের মূল দলের অনুশীলনে অনুপস্থিত ছিলেন রোনালদো। দলের ভেতরকার এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি যখন চরমে, তখন কোচ জর্জ জেসুস কোপেনহাগেনে এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিলেন যে অধিনায়ক সেদিন অনুশীলনে যোগ দেবেন। কিন্তু কোচের সেই দাবির ঠিক কয়েক মিনিট পরেই অনুশীলনে রোনালদোর অনুপস্থিতির খবর সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তোলে। কোপেনহাগেনের ঐতিহাসিক পার্কেন স্টেডিয়াম থেকে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের একটি বিশেষ গাড়িতে চড়ে স্টেডিয়াম চত্বর ছেড়ে চলে যান এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড। সে সময় দলের অন্য ফুটবলাররা যখন অনুশীলনের উদ্দেশ্যে মাঠে প্রবেশ করছিলেন, ঠিক তখনই তাকে এভাবে টিম হোটেল ও স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণ ত্যাগ করতে দেখা যায়।
ম্যাচের আগের ওই সংবাদ সম্মেলনে কোচ জর্জ জেসুস অকপটে দলের ভেতরকার কৌশলগত পরিকল্পনা এবং খেলোয়াড়দের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। ৪১ বছর বয়সী এই তারকা স্ট্রাইকারের অনুশীলনে যোগদানের বিষয়ে তিনি বলেছিলেন যে খেলোয়াড়টি এর আগে সরাসরি অনুশীলনে নামতে অস্বীকৃতি জানাননি। কোচের দাবি অনুযায়ী, দলের অন্য খেলোয়াড়দের মধ্যেও সামান্য চোট বা ক্লান্তিজনিত সমস্যা ছিল। যেমন ফ্রান্সিসকো কনসেইসাওঁ চোটের কারণে এবং জোয়াও ফেলিক্স পেশির ক্লান্তি কমানোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ায় অনুশীলনে ছিলেন না। এর বিপরীতে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জিমে নিজের ফিটনেস নিয়ে কাজ করছিলেন এবং কোচের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেদিন তার মাঠে নামার কথা ছিল।
তবে দলের একাদশে রোনালদোর ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে কোচ এবং খেলোয়াড়ের মধ্যে মতবিরোধ চরমে পৌঁছেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে কোচ অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ম্যাচের শুরুর একাদশ কিংবা ট্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শেষ কথা তিনিই বলবেন। কোচের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ছিল যে তিনি কাউকে কোনো বিশেষ সুবিধা বা গ্যারান্টি দিতে পারেন না। তিনি রোনালদোকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এই ম্যাচে তিনি শুরুর একাদশে থাকছেন না এবং তাকে বদলি হিসেবে বেঞ্চে থাকতে হবে। খেলার শেষ ৩০ মিনিটে যদি প্রয়োজন অনুভূত হয়, তবেই তাকে মাঠে নামানো হতে পারে, নতুবা নয়। কোচ আরও জোরালোভাবে বলেন যে দলের কোনো খেলোয়াড় বা অন্য কেউ তার কোচিং সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করতে পারবে না, এমনকি কোনো সভাপতিও এই ক্ষমতার বাইরে। কোচের এই অনমনীয় অবস্থানের পরেই মূলত তারকা ফরোয়ার্ডের পক্ষ থেকে এই আকস্মিক ক্যাম্প ত্যাগের সিদ্ধান্ত আসে, যা পর্তুগিজ ফুটবলে এক নতুন সংকটের সূচনা করেছে।