ফুটবলের মহোৎসব এখন নকআউট পর্বের রোমাঞ্চে বুঁদ। গ্রুপ পর্বের ৪টি গ্রুপের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে টিকে থাকা দলগুলো মেতে উঠেছে শেষ ষোলোর মহারণে। এর মাঝেই টুর্নামেন্টের প্রথম পর্বের মাঠের পারফরম্যান্স, নিখুঁত পরিসংখ্যান ও ফুটবলারদের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে সেরা একাদশ প্রকাশ করেছে ক্রীড়াঙ্গনের জনপ্রিয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ‘অপ্টা অ্যানালিস্ট’। প্রথাগত নামী তারকাদের পাশাপাশি অপ্টার এই দলে জায়গা করে নিয়েছেন এমন কিছু ফুটবলার, যাঁরা নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে পুরো ফুটবল দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।
পোস্টের নিচে ভরসার প্রাচীর
গোলপোস্টের নিচে অপ্টার সেরা পছন্দ কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলকিপার ভোজিনিয়া। স্পেনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই তাঁর অবিশ্বাস্য কিছু সেভ ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকবে। উরুগুয়ের বিপক্ষে দুটি গোল হজম করলেও তিনি ছিলেন দলের অন্যতম বড় ভরসা। আর সৌদি আরবের বিপক্ষে শেষ ম্যাচেও দেখিয়েছেন নিজের চেনা রূপ। গ্রুপ পর্বে স্পেনের উনাই সিমন ছাড়া অন্য কোনো গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার চেয়ে বেশি ম্যাচে নিজের জাল অক্ষত রাখতে (ক্লিন শিট) পারেননি।
রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী যারা
রক্ষণভাগে রাইটব্যাক হিসেবে আলো ছড়িয়েছেন ঘানার মারভিন সেনায়া। ইংল্যান্ডের শক্তিশালী আক্রমণভাগের বিপক্ষে তাঁর রক্ষণাত্মক খেলাটি ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রুপ পর্বে সবচেয়ে বেশি ১৮টি ট্যাকল এসেছে তাঁর পা থেকে। শুধু তা-ই নয়, ৩৮টি বল দখলের লড়াইয়ের (ডুয়েল) ২৪টিতেই তিনি শেষ হাসি হেসেছেন। প্রতিপক্ষের উইঙ্গারদের একা থামানোর ক্ষেত্রে (ট্রু ট্যাকলস) সেনায়ার সাফল্যের হার ৭২ শতাংশ।
সেন্টারব্যাক পজিশনে কেপ ভার্দের রূপকথার নায়ক দিনেই বোর্হেস। গ্রুপ পর্বে ৩১ বার বল ক্লিয়ার করে তিনি এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন। কমপক্ষে ২০টি ডুয়েলে জড়িয়েছেন এমন ডিফেন্ডারদের মধ্যে বোর্হেসের সাফল্যের হার ৬৮ শতাংশ, যা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তাঁর সঙ্গী হিসেবে সেন্টারব্যাকে আছেন স্পেনের ১৯ বছর বয়সী তরুণ তুর্কি পাউ কুবারসি। পজিশন সেন্স আর নিখুঁত পাসিংয়ে তিনি মুগ্ধ করেছেন সবাইকে। গ্রুপ পর্বে কুবারসির ২৯4টি পাসের মধ্যে মাত্র ৫টি মিস হয়েছে। রক্ষণভাগ ভেঙে আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে (লাইনব্রেকিং পাস) ৩৯টি সফল পাস দিয়ে তিনি আছেন শীর্ষ পাঁচে।
বাঁ প্রান্তে লেফটব্যাক হিসেবে জাপানের কেইতো নাকামুরা নিজের গতি ও ক্ষিপ্রতার প্রমাণ দিয়েছেন। নেদারল্যান্ডস ও তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জাপানের প্রথম গোলগুলো এসেছে তাঁর চমৎকার ফুটবলীয় নৈপুণ্য থেকে। ৭টি ড্রিবলিংয়ের ৫টিতেই সফল হওয়া এই ডিফেন্ডার আক্রমণে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ৯ বার।
মাঠের নিয়ন্ত্রণ যাদের পায়ে
মিডফিল্ডে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের মূল ইঞ্জিন ছিলেন ওয়েস্টন ম্যাকেনি। একটু আক্রমণাত্মক ভূমিকায় খেলে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে ওপরে ওঠায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। ওপেন প্লেতে তৈরি করা ৭টি গোলের সুযোগ তাঁকে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারের মর্যাদা দিয়েছে।
তাঁর সঙ্গে মাঝমাঠ সামলাবেন ইকুয়েডরের অবিনাশী শক্তি পেদ্রো ভিতে। বলের দখল রাখা এবং বল হারানোর পর তা কেড়ে নেওয়ার এক দারুণ সমন্বয় দেখা গেছে মেক্সিকান ক্লাব পুমাসের এই তারকার মধ্যে। ওপেন প্লে থেকে ৮টি সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি ১৪টি ট্যাকল করে তিনি আছেন সেরা তিনে। প্রতিপক্ষের পা থেকে ২৩ বার বল কেড়ে নিয়ে গ্রানিত জাকা ও রদ্রিগো বেনতাঙ্কুরের ঠিক পরেই নিজের স্থান সুসংহত করেছেন ভিতে।
আক্রমণভাগের বিধ্বংসী চতুষ্টয়
রাইট উইংয়ে যথারীতি রয়েছেন এই টুর্নামেন্টের এখন পর্যন্ত সেরা পারফরমার লিওনেল মেসি। ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা ৭ ম্যাচে গোল করার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি। চলতি আসরে মাত্র ৩ ম্যাচেই তাঁর গোলসংখ্যা ৬টি। মহাতারকা তাঁর চেনা ছন্দেই দলকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে।
বাঁ প্রান্তে ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র আছেন চেনা বিধ্বংসী রূপে। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই জালের দেখা পেয়েছেন এই সেলেসাও তারকা। পরিসংখ্যান বলে, ব্রাজিল এর আগে যে তিন আসরে গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচে গোল পেয়েছিল, প্রতিবারই তারা ট্রফি ঘরে তুলেছে। ফলে ভিনির এই ফর্ম ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের মনে নতুন আশার আলো জাগাচ্ছে।
স্ট্রাইকার পজিশনে নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড মাত্র দুই ম্যাচ খেলেই করে ফেলেছেন ৪ গোল। পেনাল্টি ছাড়া তাঁর ২.৬৮ ‘এক্সপেক্টেড গোল’ (এক্সজি) রেটিং এই আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কমপক্ষে ৫টি শট নিয়েছেন এমন ফুটবলারদের মধ্যে ৪০ শতাংশ শটকেই গোলে রূপান্তর করেছেন এই স্ট্রাইকার।
তাঁর সঙ্গী ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে যেন বিশ্বকাপের মঞ্চে বরাবরের মতোই অপ্রতিরোধ্য। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে টানা তিন ম্যাচে জোড়া বা তার বেশি গোল করা চতুর্থ খেলোয়াড় এখন তিনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৬টি গোল নিয়ে তিনি এখন মেসির ঠিক পেছনেই অবস্থান করছেন। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে উসমান দেম্বেলের দুটি গোলের পেছনের মূল কারিগরও ছিলেন এই পিএসজি তারকা। সব মিলিয়ে গতি, কৌশল আর নিখুঁত ফিনিশিংয়ের এক দারুণ মিশ্রণ ঘটেছে অপ্টার এই স্বপ্নের একাদশে।
