বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন প্রতিটি মুহূর্তই যেন একেকটি মহাকাব্য। নকআউট পর্বের রাউন্ড অব বত্রিশের হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে শুক্রবার ভোরে ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি হচ্ছে পর্তুগাল। এই ম্যাচটি কেবল টুর্নামেন্টে টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের দুই জীবন্ত কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং লুকা মদ্রিচের বিশ্বকাপ যাত্রার সম্ভাব্য শেষ অধ্যায়ও। হারলেই বিদায়—এমন সমীকরণ সামনে রেখে মাঠের লড়াইয়ের আগে পর্তুগিজ সমর্থকদের উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন সিআরসেভেন।
চলমান বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই পর্তুগিজ মহাতারকা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এটিই হতে যাচ্ছে বিশ্বমঞ্চে তাঁর শেষ আসর। ৪১ বছর বয়সে এসে আরেকটি বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা বাস্তবতার নিরিখে নেই বললেই চলে। স্বভাবতই ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে এসে শেষবারের মতো সোনালী ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখার এটাই তাঁর অন্তিম সুযোগ। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা, ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য নজির কিংবা ক্লাব ফুটবলের শত শত ট্রফি—রোনালদোর অর্জনের খাতাটা অবিশ্বাস্য রকমের সমৃদ্ধ। তবে ফুটবল বিধাতা তাঁর ক্যাবিনেটে এখনো একটি বিশ্বকাপ ট্রফি যোগ করেননি। সেই অধরা স্বপ্নকে মুঠোয় পুরতেই এবার সর্বস্ব দিয়ে লড়ছেন তিনি।
গ্রুপপর্বের অধারাবাহিকতা ও রোনালদোর ফর্ম
বিশ্বকাপের আসর শুরুর আগে ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই পর্তুগালকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রুপপর্বের পারফরম্যান্স সেই প্রত্যাশার পারদকে কিছুটা হলেও নিচে নামিয়ে এনেছে। প্রথম ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দারুণ জয় পেলেও, পরবর্তী ম্যাচগুলোতে কঙ্গো ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে নিজেদের চেনা ছন্দ খুঁজে পায়নি পর্তুগাল। মাঠের খেলায় দলগত বোঝাপড়ার অভাবটা ছিল স্পষ্ট।
ব্যক্তিগতভাবেও রোনালদো খুব একটা চেনা ছন্দে নেই। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে জোড়া গোল করে নিজের উপস্থিতির জানান দিলেও, বাকি দুই ম্যাচে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে তেমন একটা আতঙ্ক ছড়াতে পারেননি। বয়সের অমোঘ নিয়মেই তাঁর চিরচেনা গতিতে কিছুটা শ্লথভাব লক্ষ্য করা গেছে, হাতছাড়া হয়েছে কিছু সহজ সুযোগও। তবে ফুটবলপ্রেমীরা ভালো করেই জানেন, বড় ম্যাচের আসল নায়ক এই রোনালদোই। যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা তিনি এখনো রাখেন।
রোনালদোর ইনস্টাগ্রাম বার্তা
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জীবন-মরণ ম্যাচের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের মাঠে এসে দলের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। নিজের অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পর্তুগিজ সমর্থকদের উল্লাসের কয়েকটি ছবি পোস্ট করেছেন তিনি। সেই পোস্টের ক্যাপশনে সিআরসেভেন লিখেছেন, ‘মেক আস ফিল অ্যাট হোম।’ যার সহজ বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, ‘আমাদের এমন অনুভূতি দাও যেন মনে হয় আমরা ঘরের মাঠেই খেলছি।’
রোনালদো ভালো করেই বোঝেন, নকআউটের এই স্নায়ুচাপের ম্যাচে গ্যালারির সমর্থন কতটা বড় টনিক হিসেবে কাজ করতে পারে। গ্যালারিভর্তি লাল-সবুজ সমর্থকদের চিৎকার মাঠে খেলোয়াড়দের বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাবে, এটাই তাঁর বিশ্বাস।
শুক্রবার ভোরে যখন পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া মাঠে নামবে, তখন ফুটবলবিশ্ব কেবল দুটি দেশের লড়াই দেখবে না। সবাই তাকিয়ে থাকবে রোনালদো এবং মদ্রিচের দিকে। স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক দুই সতীর্থ যখন একে অপরের মুখোমুখি হবেন, তখন একজনের মুখে হাসি ফুটলেও অন্যজনকে অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় নিতে হবে বিশ্বমঞ্চ থেকে। এখন দেখার বিষয়, রোনালদোর এই বিশেষ আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমর্থকরা পর্তুগালকে ঘরের মাঠের আবহ এনে দিতে পারেন কি না এবং সেই শক্তিতে বলীয়ান হয়ে পর্তুগাল তাদের বিশ্বকাপ মিশন টিকিয়ে রাখতে পারে কি না।
