বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পরপরই কোচের পিতৃবিয়োগ, কঙ্গো শিবিরে শোক

বিশ্বকাপের নকআউটের জমজমাট লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো। তবে ফুটবল মাঠের এই হারকেও ছাড়িয়ে গেছে ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনের এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। দলের বিদায়ের ঠিক পরপরই সংবাদ সম্মেলন চলাকালে নিজের বাবার মৃত্যুসংবাদ পান কঙ্গোর ফরাসি প্রধান কোচ সেবাস্তিয়ান দেশাব্রে। ম্যাচ হারের বেদনার মাঝে হঠাৎ আসা এই পারিবারিক বিপর্যয় কঙ্গো ফুটবল দলসহ পুরো ক্রীড়াঙ্গনে শোকের ছায়া ফেলে দিয়েছে।

বুধবার ম্যাচ শেষ হওয়ার পর নিয়মমাফিক সংবাদ সম্মেলনে আসেন দেশাব্রে। সেখানে ম্যাচ ও দলের পারফরম্যান্স নিয়ে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনের একেবারে শেষ দিকে কঙ্গো দলের মিডিয়া কর্মকর্তা হঠাৎ মাইক্রোফোন হাতে নেন এবং ফরাসি ভাষায় একটি জরুরি ঘোষণা দেন। তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। তবে এই মুহূর্তে আমরা একটি অত্যন্ত দুঃখজনক খবর জানাতে চাই। আমাদের কোচ আজ তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন।’ এরপর তিনি কোচের উদ্দেশ্যে পুরো দলের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।

স্তব্ধ সংবাদ কক্ষ ও ঐতিহাসিক যাত্রা

হঠাৎ সংবাদ সম্মেলনের মাঝখানে এমন এক দুঃসংবাদ আসবে, তা কক্ষের কেউ ভাবতেও পারেননি। খবরটি শোনার সাথে সাথেই স্তব্ধ হয়ে যান কোচ দেশাব্রে। তাঁর মুখাবয়বে নেমে আসে গভীর বিষণ্ণতা। কোনো রকমে ফিসফিস করে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে ‘ধন্যবাদ’ শব্দটি উচ্চারণ করে দ্রুত সংবাদ সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর এই আকস্মিক প্রস্থানে গুমোট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের মাঝেও।

গত চার বছর ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কঙ্গো জাতীয় ফুটবল দলের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন এই ফরাসি মাস্টারমাইন্ড। তাঁর হাত ধরেই দীর্ঘ ৫০ বছরের খরা কাটিয়ে ১৯৭৪ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে আফ্রিকার এই দেশটি। টুর্নামেন্টের কঠিনতম গ্রুপ ‘জে’-তে জায়গা পেয়েছিল তারা। যেখানে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল এবং লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি কলম্বিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করতে হয়েছে তাদের। গ্রুপপর্বের সেই কঠিন বাধা টপকে দলটিকে নকআউটের রাউন্ড অব বত্রিশে নিয়ে এসে ফুটবল দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন দেশাব্রে।

মাঠের লড়াই ও স্বপ্নভঙ্গ

ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে মাঠের লড়াইয়েও কঙ্গো কোনো ধরনের সমীহ দেখায়নি। ম্যাচের শুরুটা ছিল তাদের জন্য একদম স্বপ্নের মতো। খেলা শুরুর মাত্র সপ্তম মিনিটেই ব্রায়ান সিপেঙ্গার দুর্দান্ত এক গোলে লিড নেয় আফ্রিকান পরাশক্তিরা। প্রথমার্ধের পুরোটা সময় তারা ইংলিশ রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রাখে এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।

তবে দ্বিতীয়ার্ধে নিজেদের অভিজ্ঞতার পুরো ফায়দা তোলে ইউরোপের দলটি। বিশেষ করে ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইনের জোড়া গোল ম্যাচের পুরো দৃশ্যপট বদলে দেয়। কেইনের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে কঙ্গোকে ২-১ গোলে হারিয়ে পরের রাউন্ড নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড। ম্যাচ শেষে যখন মাঠের হারের ক্ষত সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন দেশাব্রে, ঠিক তখনই জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত ধাক্কাটি আসে তাঁর ওপর। ফুটবল থেকে বিদায় আর প্রিয়জনকে হারানোর এই দ্বিমুখী শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো কঙ্গো শিবির।

মন্তব্য করুন