জুডো খেলার নিয়মাবলী
আধুনিক বিশ্বে জুডো খেলা একটি জনপ্রিয় খেলা। এই খেলার অত্যধিক জনপ্রিয়তার কারণেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এই খেলার প্রতি অধিকহারে ঝুঁকে পড়ছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। বর্তমানে আমাদের দেশেও জুডোর চাহিদা অত্যধিক। বিশেষ করে যুব শ্রেণীর তরুণ-তরুণীরাই জুডো খেলার প্রতি বেশি করে আসক্ত হয়ে পড়েছে।
জুডো খেলার উৎপত্তি জাপানে। এখন থেকে একশো বছর আগে জাপানে এ খেলার প্রথম আবির্ভাবঘটে। ১৮৮৫ সালে প্রথম জুডো খেলা হবার কথা জানা যায়। প্রাচীন জাপানী খেলা ‘জুজুৎসু’ থেকে জুডো খেলার উৎপত্তি। জুড়ো বা Judo কে ভেঙ্গে অর্থ করলে দাঁড়ায় এরকম Jo অর্থ সরল আর Do অর্থ পথ। Judo অর্থ মল্লযুদ্ধের সরল পথ ।
উৎপত্তির পর থেকেই দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। ১৯৫১ সালে জুডো আন্তঃদেশীয় খেলা হিসেবে জাপানে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৬৪ সালে অলিম্পিকে ঘুষো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ক্রমে হুড়ো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
Table of Contents
জুডো খেলার নিয়মাবলী । খেলাধুলার আইন
জাপানী ভাষায় জুডো জিমন্যাসিয়াম বা জুডো খেলার স্থানকে বলা হয় ‘ডোজো’। এই ডোজো ৩×৬ ফুট আকারের গদি দিয়ে মোড়া একটি বিশেষ জায়গা। জায়গার আকৃতি অনুযায়ী একটি প্রতিযোগিতার জন্য ২৫ থেকে ৫০ টি গদি পাততে হবে। কোন বড় প্রতিযোগিতার জন্যে ৫০ টি গদি থাকা দরকার।
জুডো লড়াইয়ের সময় খেলোয়াড়েরা খালি পায়ে থাকবেন। এমন ধরণের পোশাক পরবেন যাতে কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত খালি থাকে। পায়ের দিকে গোড়ালি থেকে উপরের দিকে ৬ ইঞ্চি পর্যন্ত খালি থাকবে। কোমরের বেল্ট ও জ্যাকেটটি তৈরি হবে জিন্সের। হাত ও পায়ে নখ থাকবে না।
জুডো খেলা বই পড়ে শেখা যায় না। এটি হাতে কলমে শিখতে হয়। তবুও সাধারণ কিছু বিষয় এখানে উল্লেখ করা হলো। জুডো খেলার আগে বেশ ব্যায়াম করতে হয়। এই ব্যায়ামগুলি করা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়
(ক) পেশী উন্নতির ব্যায়াম।
(খ) গা ঘামানোর ব্যায়াম।
(গ) আছাড় খাওয়ার ব্যায়াম।
(ঘ) বিভিন্ন টেকনিক আয়ত্বে আনার ব্যায়াম।
আগেই বলা হয়েছে জুডো খেলার জন্য নিজেকে তৈরি করার পূর্ব শর্ত হচ্ছে, ব্যায়াম করে নিজকে উপযোগী করে তোলা। জুডোর টেকনিকের মধ্যে আছাড় খাওয়া হলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং আছাড় খাওয়াকে আয়ত্ব করা দরকার সবার আগে। নির্ভুলভাবে এই পদ্ধতি আয়ত্বে আনতে পারলে খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস অনেকগুণ বেড়ে যায় । তখন সে নির্ভুলভাবে আত্মরক্ষা ও আঘাত করতে পারে। তাবে এটিও গা ঘামানোর ব্যায়ামের আওতায় পড়ে।
পিছনে পাছাড়
গদিতে বসে পা দু’টি সামনের দিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। যেন দুই হাঁটু ও গোড়ালি। কাছাকাছি থাকে। দুই হাত থাকবে দুই হাঁটুর উপর এবং মাথা সোজা ও চোখ সামনের দিকে থাকবে।
এবার হাত তুলে পিছনে পড়ার জন্য তৈরি হতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু কোমর গদিতে থাকবে। পা দু’টো একটু উপরে উঠবে। হাত ও মাথা সামান্য উপরে থাকবে। অর্থাৎ এই অবস্থায় জুডো খেলোয়াড়কে দেখতে হবে ধনুকের মত। এবার কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত গদিতে নেমে আসবে। পা দু’টি বেঁকে মাথার সমান্তরাল হবে। সেই সাথে বা হাতের তালু দিয়ে গদিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই জোরে শব্দ করাই জুডোর রীতি ।
তাচিওয়াজা বা ছোঁড়ার কৌশল
তাচিওয়াজাকে অনেকে নাগেওয়াজা বলে। এটি হল ছোঁড়ার কৌশল। জুডোর আকর্ষণীয় হলো এই ছোড়া। তাচিওয়াজা শুরুর আগে সামনের দিকে তাকিয়ে পা একটু থাক করে অত্যন্ত সহজভাবে দাঁড়াতে হবে। একে বলে সিজেন তাই ৷ ক্লান্ত না থাকলে সিজেন তাই থেকে যে কোন অবস্থায় যাওয়া যায়।
মিজিসিজেন তাই বলতে বুঝায় ডান পা সামান্য সামনের দিকে এগিয়ে রেখে দাঁড়ানো আর হিদারিসিজেনতাই হলো বাঁ পা এগিয়ে থাকা। জিগোতাই হলো দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে হাঁটু দু’পাশে ভেঙ্গে দাঁড়ানো, তবে এই অবস্থায় দাঁড়ালে সহজে অন্য অবস্থায় যাওয়া সম্ভব হয় না বা দ্রুত ঘোরা সম্ভব হয় না। একারণে সিজেন তাই হচ্ছে উত্তম ব্যবস্থা।
এবার জানা দরকার কিভাবে বিপক্ষ খেলোয়াড় বা প্রতিপক্ষকে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে জানা দরকার কুমিকাটা কাকে বলে। বিপক্ষ বা প্রতিপক্ষের পোশাক ধরার পদ্ধতিকে কুমিকাটা বলে। মিজিসিজেনতাইয়ের পরে নিজের বাঁ হাত দিয়ে ধরতে হবে কলারের ঠিক নিচের অংশ। ডান দিকে ছুঁড়ে ফেলার এই হলো উত্তম পদ্ধতি । ছোট আঙ্গুল দিয়ে সজোরে জামা ধরতে হবে একটু বেঁকিয়ে। তারপর একটু এদিক ওদিক নাড়াচাড়া করতে হবে তা না হলে বিপক্ষের উদ্দেশ্য বোঝা যাবে না।
বাঁ দিকে অর্থাৎ হিদারিওয়াজা পদ্ধতিতে গেলে উপরের পদ্ধতি বিপরীতভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
কুমিকাটা বা প্রতিপক্ষকে ধরার আর একটি পদ্ধতি আছে। যেমন, ডান হাত দিয়ে বিপক্ষের বাঁ দিকের কলারের নিচে ও বাঁ হাত দিয়ে ডান দিকের বুকের কাছে জামার অংশ ধরা। আত্মরক্ষার জন্য এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। তবে এই পদ্ধতিতে বিপক্ষের অনেক সুবিধা হয় ।
ইপ্পন শিওনেজ বা একহাতে কাঁধের উপর ছুঁড়ে ফেলা
(ক) এই পদ্ধতিতে ক খেলোয়াড় এই পদ্ধতি প্রয়োগের আগে খ বা বিপক্ষ খেলোয়াড় ডান পা এগিয়ে দিলে খ খেলোয়াড়কে বাঁ পা কিছুটা পিছিয়ে আনতে হবে ও ডান গোড়ালি খ খেলোয়াড়ের ডান পায়ের কাছে নিতে হবে।
(খ) এবার গোড়ালিতে ভারসাম্য বজায় রেখে কোমর পিছনে নিয়ে একটু ঝুঁকে পিছন দিক থেকে ক খেলোয়াড়কে কাঁধে তুলতে হবে।
(গ) ক খেলোয়াড় আরো ঝুঁকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে খ বা বিপক্ষ খেলোয়াড়ের ডান হাত ক খেলোয়াড়ের ডান হাতে হুকের মত আটকে থাকবে । এই সময় বিপক্ষ খেলোয়াড় সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলে।
হানেগোসি বা পাছায় তুলে ছোঁড়া
(ক) খ বা বিপক্ষ খেলোয়াড় ডান পা এগিয়ে দিলে ক খেলোয়াড় সামান্য পিছনে এস বা গোড়ালি ঘুরিয়ে দাঁড়াবে অথবা হাঁটু বেঁকিয়ে ভারসাম্য রাখতে হবে।
(খ) এবারে থ খেলোয়াড়ের ভারসাম্য নষ্ট করার জন্য তার ডান হাতের কনুইয়ের জামা ধরে ক খেলোয়াড় বাঁ হাত দিয়ে নিজের কোমর ডান দিকে তুলতে থাকবে।
(গ) ক খেলোয়াড় খ খেলোয়াড়কে দেহের উপরে তোলার সময় ডান পা দিয়ে তার শিনবোনের উপর ধাক্কা দেবে। খ খেলোয়াড় আরো উপরে উঠলে ক খেলোয়াড় বাঁ দিকে মাথা ঘুরিয়ে, শরীর ঘুরিয়ে খেলোয়াড়কে ছুঁড়ে ফেলবে।
উচিমাতা বা পাছার উপর তুলে ভিতরে ছোঁড়া
(ক) খেলোয়াড় ক খেলোয়াড়কে ভিতরে টানবে। এই সময় ক খেলোয়াড় তার এক পা ডান দিকে পিছিয়ে দেবে।
(খ) এবার খ কে ধরে ক খেলোয়াড় বা পায়ের উপর শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে ডান দিকের কোমর তুলবে।
(গ) এবার খ খেলোয়াড়ের ডান হাত ক খেলোয়াড় নিজের বুকের কাছে আনবে। ক এর ডান পা খ এর দুই পায়ের মাঝখানে থাকবে। ক নিজের ডান দিকের পাছা দিয়ে খ এর ডান দিকের উরুতে ধাক্কা দেবে।
(ঘ) শেষে ক ডান পা উঁচুতে তুলে এবং দেহের উপরের অংশ মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে মাথা ডান দিকে নিয়ে খ কে ছুঁড়ে ফেলবে ।
ওশোটো, ওটোশি বা ড্রপ দিয়ে ছোঁড়া
(ক) খ খেলোয়াড় বা প্রতিপক্ষ যদি একটু ঝুঁকে দু’পা ফাঁক করে দাঁড়ায় তবে ক খেলোয়াড় ও হাঁটু বেঁকিয়ে একইভাবে দাঁড়াবে ।
(খ) এবারে ক বাঁ পা, খ এর ডান কোমরের উপর তুলে দিয়ে জামা ধরে টান। মারলে, খ এর ভারসাম্য নষ্ট হবে।
(গ) সবশেষে ক কে ডান হাঁটু তুলে চাপ দিতে হবে। পায়ের পাতা যাবে যদি বা মাটির দিকে এবং খ এর দুই পায়ের মধ্যে ঢুকবে। তারপর ক ঐ পা নিজের দিকে টেনে আনবে ও ঝুঁকে পড়ে ‘খ’ কে ফেলে দেবে।
টোমোনেজ বা সামারসন্টের মত ছোঁড়া
(ক) খ প্রতিপক্ষকে পিছন থেকে ঠেলতে হবে।
(খ) প্রতিপক্ষ বা খ তখন ক কে রুখতে চেষ্টা করবে।
(গ) ক তখন তার বাঁ পা খ এর দুই পায়ের মাঝামাঝি ঢুকিয়ে দেবে এবং খ কে ধরে চিৎ করে শুইয়ে দেবে।
(ঘ) এবার ক ডান পা খ এর তলপেটে রেখে দুহাত ধরে তাকে টানতে থাকবে।
(ঙ) ভারসাম্য হারালে তখন পা দিয়ে জোরে তল পেটে ধাক্কা দেবে এবং দুই হাত জোরে টানবে।
উদেগরামি বা হাতে তালা লাগানো
যে কে শুইয়ে ফেলে ক বাঁ হাত দিয়ে খ এর কব্জি ধরবে এবং নিজের বাঁ হাত দিয়ে খ এর কনুইয়ের নিচে ঢুকে ডান হাতকে জোরদার করার জন্য ডান হাতের কব্জি আটকে রাখবে।
মুষ্টি
ছোড়া ছাড়াও দুষ্টাঘাত জুডোর একটি অংশ বলা যায়। এ জন্য হাতকে অসি বলা হয়। জুডোতে মুষ্টি হলো বড় অস্ত্র। বিভিন্ন ধরনের মুষ্টি দ্বারা প্রতিপক্ষকে আঘাত করা যায়। মুষ্টিগুলি এরূপ হতে পারেঃ (ক) সাধারণ মুষ্টি (খ) পার্শ্ব মুক্তি (গ) ইনভারটেড মুষ্টি (ঘ) পশ্চাৎ মুষ্টি (ঙ) পারসিয়াল মুষ্টি (চ) হাতুড়ি মুষ্টি (ছ) তর্জনী মুক্তি (জ) মধ্যমা মুষ্টি প্রভৃতি। মুষ্টাঘাত প্রয়োগে প্রতিপক্ষকে সহজে পরাস্ত করা সম্ভব। এ ছাড়াও অর্ঘ্য্যমুদ্রা হাত, পক্ষি চঞ্চমুদ্রা হাত, হাতের প্রভৃতি প্রয়োগ করা হয় ।
কনুই
বাহুর সবচেয়ে বড় শক্ত অংশ কনুই। আত্মরক্ষা ও প্রতিপক্ষকে জব্দ করার জন্য কনুই ব্যবহার করা হয়। কনুইয়ের ব্যবহার গুলি এরকমঃ (ক) কনুইয়ের গুঁতো (খ) কনুই দিয়ে পেছনে গুঁতো (গ) কনুই দিয়ে পার্শ্বে তঁতো (ঘ) কনুইয়ের সম্মুখে গুঁতো ইত্যাদি ।
পা
পা ও কনুইয়ের মত পা ও একটি বড় অস্ত্র। মারাত্মক তো বটেই। পায়ের আঘাত প্রচন্ড প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাছাড়া দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে পাদদ্বয়। পা দিয়ে পাঁচ প্রচার লাথি। মারা যায়। (ক) সম্মুখে লাথি মারা (খ) পায়ের ধার দিয়ে লাথি (গ) হিল দিয়ে লাখি (ঘ) মরণ লাথি (ও) জোড়া লাথি ।
খেলার শ্রেণী বিভাগ
জুড়ো ক্যারাটে কুংফুতে উন্নততর নৈপুণ্য দেখাতে পারলে বিভিন্ন রকমের বেল্ট পরতে দেয়া হয়। ক্রমানুসারে বেল্টগুলি তুলে ধরা হলো
| জুনিয়র গ্রুপ | ||
| কিয়ু | বেল্ট | |
| ১। নবম কিয়ু | হলুদ বেল্ট | |
| ২। অষ্টম কিয়ু | কমলা বেল্ট | |
| ৩। সপ্তম কিয়ু | কমলা বেল্ট | |
| ৪ । ষষ্ঠ কিয়ু | সাদা বেল্ট | |
| ৫। পঞ্চম কিয়ু | গো কিয়ু | সাদা বেল্ট |
| ৬। চতুর্থ কিয়ু | য়োন কিয়ু | সাদা বেল্ট |
| ৭। তৃতীয় কিয়ু | সান কিয়ু | হলুদ বেল্ট |
| ৮ । দ্বিতীয় কিয়ু | নি কিয়ু | হলুদ বেল্ট |
| ৯। প্রথম কিয়ু | ইক্কয়ু | হলুদ বেল্ট |
| সিনিয়র গ্রুপ | |
| ডান | বেল্ট |
| ১। সেডান | ১ম ডান কালো বেল্ট |
| ২। নিডান | ২য় ডান কালো বেল্ট |
| ৩। সনেডান | ৩য় ডান কালো বেল্ট |
| ৪। য়োনডান | ৪র্থ ডান কালো বেল্ট |
| ৫। গোড়ান | ৫ম ডান কালো বেল্ট |
| ৬। রোকুডান | ৬ষ্ঠ ডান লাল সাদা বেল্ট |
| ৭। সিডিয়ান | ৭ম ডান লাল সাদা বেল্ট |
| ৮ । হাচিডান | ৮ম ডান লাল সাদা বেল্ট |
| ৯। কিয়ডান | ৯ম ডান লাল বেন্ট |
| ১০। জুডান | ১০ম ডান লাল বেন্ট |
| ১১। জুই চিড়ান | একাদশ ডান লাল বেন্ট |
| ১২। জুনিডান | দ্বাদশ ডান সাদা বেস্ট |
