সাত ম্যাচে দুই জয়—রিয়াল মাদ্রিদের সংকট কোথায়, আলোনসোর সামনে কোন পথ?

রিয়াল মাদ্রিদ মানেই জয়ের সুনাম, মানেই দাপট, মানেই বড় ম্যাচে বড় মানসিক শক্তি। গত দুই দশকে ক্লাবটির হয়ে যারা খেলেছেন—রোনালদো, রামোস, বেনজেমা, মডরিচ, ক্রুস, মার্সেলোর মতো কিংবদন্তি—তাঁরা কেবল দক্ষতা নয়, এক অবিশ্বাস্য নেতৃত্বগুণ দিয়ে মাঠ দাপিয়েছেন। শেষ মুহূর্তে গোল, পিছিয়ে থেকেও জয়ের মানসিকতা—এসবই ছিল “রিয়াল ডিএনএ”-র অংশ। কিন্তু আজকের রিয়াল মাদ্রিদের দিকে তাকালে মনে হয়, সেই ডিএনএ কোথাও যেন হারিয়ে গেছে।

সেল্তা ভিগোর কাছে বার্নাব্যুতে ২–০ গোলের পরাজয় শুধু পয়েন্ট হারানো নয়, এটি রিয়ালের নেতৃত্ব সংকটকে নগ্ন করে দিয়েছে। ম্যাচে যখন রিয়াল ১–০ গোলে পিছিয়ে—সমর্থকদের মনে তখনই প্রশ্ন: এই দলে নেতৃত্ব দেবে কে? বেনজেমার মতো শান্ত নেতৃত্ব, রামোসের মতো আগুন—এ দুটোর কোনোটিই বর্তমান দলে দেখা যায় না।

যদিও রিয়ালের খেলোয়াড়দের গুণাগুণ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই—সকল পজিশনে তারকার ছড়াছড়ি—কিন্তু তারা দল হিসেবে খেলে না। বিশ্বাসের অভাব, পজিশন ধরে রাখার অস্থিরতা, আর সবচেয়ে বড়—মানসিক ভেঙে পড়া। ম্যাচে পিছিয়ে পড়লেই খেলোয়াড়দের চোখেমুখে হাল ছেড়ে দেওয়ার ছাপ দেখা যায়।

চোট সমস্যা অবশ্যই আছে। দলের অর্ধেক ডিফেন্স নিয়মিত ইনজুরিতে। সেল্তার ম্যাচে দুই লাল কার্ডে ফুল–ব্যাক পজিশন আরও দুর্বল। তবে এগুলো পার্শ্বচরিত্র—মূল সমস্যা মানসিকতা ও নেতৃত্ব।

জাবি আলোনসোর আগমনে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেলেও এখন মনে হচ্ছে তিনিও দিশা হারিয়েছেন। তাঁর সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে অদ্ভুত এক এলোমেলো ভাব। একাদশ নির্বাচন, হঠাৎ বদলি, একই পরিকল্পনা বারবার প্রয়োগ—সবই বিতর্ক তুলছে। খেলোয়াড়রাও সুযোগ পেলেও কাজ ঠিকমতো করতে পারছেন না।

অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—রিয়াল কি আবার কোচ পরিবর্তন করবে? জিদান? ক্লপ? কিন্তু প্রশ্ন হলো—এমন অবস্থায় তাঁরা দায়িত্ব নিতে রাজি হবেন? বিশেষ করে যখন দলের ভেতরে আত্মবিশ্বাসের এত সংকট?

সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা আক্রমণভাগ। ফরোয়ার্ড রদ্রিগো টানা ৩১ ম্যাচ ধরে গোল পাচ্ছেন না! তবুও তাকে খেলানো হচ্ছে। বেঞ্চে এনদ্রিকের মতো প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড় বসে থাকেন—যাকে নামানো হলে অন্তত নতুন কিছু চেষ্টা করা যেত। কিন্তু আলোনসো সেই ঝুঁকি নেন না।

মজার বিষয়—এনদ্রিক যখন একমাত্র ম্যাচে ডান উইংয়ে সুযোগ পেয়েছিলেন, মাত্র ১১ মিনিটেই নজর কাড়েন। তবুও তাকে প্রায় পুরো মৌসুমেই ব্যবহার করা হচ্ছে না। এতে তার হতাশা বাড়ছে, এমনকি জানুয়ারিতে লিঁওতে যাওয়ার গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে।

রিট ব্যাকে অ্যাসেনসিওকে খেলানো ছিল আরেক ব্যর্থ সিদ্ধান্ত। তিনি সেন্টার–ব্যাক, ফলে আক্রমণে কোনো অবদান রাখতে পারেননি। যদি সামনে এনদ্রিক থাকতেন, হয়তো অ্যাসেনসিও কিছুটা স্বস্তি পেতেন।

শুধু আক্রমণই নয়, রিয়ালের মাঝমাঠ প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাল মিলাতে পারছে না, ডিফেন্স ক্রস বা সেট পিসে ভয়াবহ দুর্বল। সর্বশেষ সাত ম্যাচে মাত্র দুটি জয়—লা লিগার শেষ পাঁচ ম্যাচে মাত্র একটি জয়—এটা রিয়ালের ইতিহাসের সঙ্গে যায় না।

আলোনসোকে আনা হয়েছিল পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে। কিন্তু তিনি বরং তারকা খেলোয়াড়দের খুশি রাখতে গিয়ে নিজের ফুটবল দর্শন থেকে সরে এসেছেন। রিয়ালের দর্শন স্পষ্ট—কেউ ক্লাবের চেয়ে বড় নয়। কিন্তু আলোনসোর সিদ্ধান্তগুলোতে সেই দৃঢ়তা দেখা যাচ্ছে না।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বলছে—রিয়ালকে বাঁচাতে দরকার নেতৃত্ব, চরিত্র ও সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা। আলোনসোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তিনি কি রিয়ালের কোচ হয়ে জিততে এসেছেন, নাকি সবাইকে খুশি রাখতে?

দুটো একসঙ্গে কখনোই সম্ভব নয়।

Leave a Comment