২০২৬ বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের ডিজিটাল প্রতিরূপ: অফসাইড বিতর্কের অবসান

ফুটবলের আধুনিকায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহার নতুন কিছু নয়, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপ এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ঘোষণা করেছে যে, আসন্ন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য এআই-চালিত ত্রিমাত্রিক (3D) ‘ডিজিটাল অবতার’ তৈরি করা হবে। মূলত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তিকে (SAOT) নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত করতেই এই বিপুল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত বিশ্বখ্যাত ‘কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক শো’ (CES)-তে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই রোমাঞ্চকর তথ্য প্রকাশ করেন।

ডিজিটাল অবতার তৈরির প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয়তা

আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ অংশগ্রহণ করবে। প্রতিটি দলের ২৬ জন খেলোয়াড় হিসেবে মোট ১,২৪৮ জন ফুটবলারের ব্যক্তিগত ডিজিটাল স্ক্যান সম্পন্ন করবে ফিফা। টুর্নামেন্ট শুরুর প্রাক্কালে খেলোয়াড়দের যখন অফিসিয়াল ফটোশুট হবে, তখনই একটি বিশেষ চেম্বারে মাত্র এক সেকেন্ডে এই স্ক্যানিং কাজ শেষ করা হবে। এর ফলে খেলোয়াড়ের শরীরের সুক্ষ্ম মাপ এবং হাড়ের গঠন ডিজিটাল চিত্রে সংরক্ষিত হবে।

বর্তমানে অফসাইড প্রযুক্তিতে খেলোয়াড়দের যে গ্রাফিক্যাল রূপ ব্যবহার করা হয়, তা অনেকটা জ্যামিতিক কাঠামোর মতো। ফলে খেলোয়াড়ের প্রকৃত শরীরের মাংসপেশি বা অঙ্গভঙ্গির সঙ্গে গ্রাফিকসের সামান্য পার্থক্য থেকে যায়। নিউক্যাসল বনাম ম্যানচেস্টার সিটির একটি ম্যাচে রুবেন দিয়াজের অফসাইড গ্রাফিকস নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক এর বড় উদাহরণ। ফিফার দাবি, খেলোয়াড়দের নিজস্ব শরীরের মাপ ব্যবহার করে অবতার তৈরি করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এ ধরণের কোনো বিভ্রান্তি আর থাকবে না।

নিচে ২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন এই প্রযুক্তি প্যাকেজের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরা হলো:

২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন প্রযুক্তি ও এর কার্যকারিতা

প্রযুক্তির ক্ষেত্রবিস্তারিত ও বৈশিষ্ট্যলক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
থ্রি-ডি অবতার১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ডিজিটাল প্রতিরূপ।অফসাইড সিদ্ধান্তে শারীরিক গঠনের নির্ভুলতা।
ডেটা ট্র্যাকিং৩০টি ক্যামেরা ও খেলোয়াড় প্রতি ১০,০০০ ডেটা পয়েন্ট।বল ও খেলোয়াড়ের দ্রুত গতির অবস্থান শনাক্ত করা।
স্ক্যানিং সময়ফটোশুটের সময় মাত্র ১ সেকেন্ডের দ্রুত প্রক্রিয়া।খেলোয়াড়দের জন্য বাড়তি পরিশ্রম কমিয়ে আনা।
আউট অফ প্লে প্রযুক্তিবল মাঠের বাইরে গেছে কি না তা শনাক্ত করার নতুন সেন্সর।গোল হওয়ার আগে বলের অবস্থান নিশ্চিত করা।
থ্রি-ডি রিক্রিয়েশনদৃষ্টিসীমা (Line of Sight) ভিত্তিক অফসাইড নির্ণয়।ভিএআর রেফারির সিদ্ধান্ত প্রদান দ্রুততর করা।

মাঠে পরীক্ষার ফলাফল ও ফিফা সভাপতির প্রত্যাশা

এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করতে ফিফা ইতিমধ্যে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে ফ্ল্যামেঙ্গো ও পিরামিডস এফসির খেলোয়াড়দের ওপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করেছে, যা অত্যন্ত সফল হয়েছে। জিয়ান্নি ইনফান্তিনো মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে আয়োজিতব্য ১০৪ ম্যাচের এই বিশ্বকাপটি হবে ‘পৃথিবীর সর্বকালের সেরা আয়োজন’।

খেলোয়াড়দের এই ডিজিটাল অবতার কেবল অফসাইড সিদ্ধান্তেই সাহায্য করবে না, এটি টেলিভিশন সম্প্রচারে দর্শকদের জন্য আরও স্বচ্ছ ও দৃষ্টিনন্দন গ্রাফিক্স নিশ্চিত করবে। এছাড়া ‘রিয়েল-টাইম থ্রি-ডি রিক্রিয়েশন’ প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন সব অফসাইড ধরা সম্ভব হবে, যা বর্তমানে মানুষের চোখে বা সাধারণ ক্যামেরায় প্রায় অসম্ভব।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ফিফা কেবল অফসাইড নয়, বরং গোল-লাইন প্রযুক্তি এবং বল মাঠের বাইরে যাওয়ার বিষয়গুলো নিয়েও কাজ করছে। সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে প্রযুক্তির এক চরম উৎকর্ষের প্রদর্শনী, যেখানে মানুষের সামান্যতম ভুল বা যান্ত্রিক ত্রুটির সুযোগ থাকবে না বললেই চলে।

Leave a Comment