বিশ্বকাপের মঞ্চে আরও একটি মহাকাব্যিক লড়াইয়ের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক ফুটবলকে থামিয়ে দিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় চমক দেখাল ইউরোপের দেশ নরওয়ে। আর এই ঐতিহাসিক জয়ের নায়ক আর কেউ নন, ম্যানচেস্টার সিটির তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। তার দানবীয় পারফরম্যান্সে লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে বিদায় করে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার গৌরব অর্জন করল নরওয়ে। অন্যদিকে, এই পরাজয়ে ব্রাজিলের হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) জয়ের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আরও একবার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
Table of Contents
প্রথমার্ধের উত্তেজনা ও পেনাল্টি মিসের হতাশা
যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল টানটান উত্তেজনা। গ্যালারিভর্তি দর্শকদের রোমাঞ্চ উপহার দিয়ে ম্যাচের চতুর্থ মিনিটেই ব্রাজিলের জালে বল পাঠিয়েছিল নরওয়ে। প্যাটট্রিক বার্গের সেই শটে পুরো স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে গেলেও রেফারির অফসাইডের বাঁশিতে প্রাণ ফিরে পায় ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা।
প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ম্যাচের দশম মিনিটেই লিড নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পায় সেলেসাওরা। ডি-বক্সের ভেতরে ব্রাজিলের ম্যাথিউস কুনহাকে নরওয়ের এক ডিফেন্ডার ফাউল করলে ভিএআরের (VAR) সাহায্যে পেনাল্টি ঘোষণা করেন রেফারি। কিন্তু পেনাল্টি কিক নিতে আসা ব্রুনো গুইমারেসের শটটি অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নাইল্যান্ড। প্রথমার্ধের শেষদিকে কুনহা এবং গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি দূরপাল্লার শটে গোল করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও নরওয়ের রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় গোলশূন্যভাবেই শেষ হয় প্রথমার্ধ।
বদলি খেলোয়াড়দের লড়াই ও এন্দ্রিকের সুযোগ হাতছাড়া
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই কৌশলী পরিবর্তন আনেন নরওয়ের কোচ। মাঠে নামানো হয় অস্কার বব ও আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপকে। অন্যদিকে, ম্যাচের ৫৮তম মিনিটে ব্রাজিলের অভিজ্ঞ কোচ কার্লো আনচেলত্তি ম্যাথিউস কুনহাকে তুলে মাঠে নামান তরুণ তুর্কি এন্দ্রিককে। মাঠে নামার প্রথম মিনিটেই গোলের এক অবিশ্বাস্য সুযোগ নষ্ট করেন এই উদীয়মান তারকা। বাম প্রান্ত থেকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের বাড়ানো নিখুঁত পাস ধরে নরওয়ের বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন এন্দ্রিক। সামনে কেবল গোলরক্ষক থাকলেও তার নেওয়া হালকা টোকার শটটি গোলবারের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়।
ম্যাচের ৬২তম মিনিটে রায়ানের এক দুর্দান্ত দূরপাল্লার শট এবং পরবর্তী মিনিটে গুইমারেসের আরও একটি আক্রমণ নস্যাৎ করে নরওয়ের ত্রাতা হয়ে থাকেন গোলরক্ষক নাইল্যান্ড। ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে ব্রাজিল সমর্থকদের উল্লাসে ভাসিয়ে মাঠে নামেন ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার জুনিয়র এবং রক্ষণভাগের দানিলো।
হালান্ড ঝড় ও নরওয়ের ঐতিহাসিক জয়
ম্যাচের সবটুকু রোমাঞ্চ যেন জমা ছিল শেষ ১০ মিনিটের জন্য। ৭৯তম মিনিটে নিউজার্সির পুরো স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেন আর্লিং হালান্ড। ডানপ্রান্ত থেকে আসা এক ক্রসকে দুর্দান্ত হেডে ব্রাজিলের গোলরক্ষক আলিসন বেকারকে পরাস্ত করে নরওয়েকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন তিনি।
এখানেই শেষ নয়, ম্যাচের ৮৯তম মিনিটে ব্রাজিলের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন হালান্ড নিজেই। ডি-বক্সের বেশ কিছুটা দূর থেকে নেওয়া তার এক বুলেট গতির শট আলিসনকে ফাঁকি দিয়ে ব্রাজিলের জালে জড়ায় (২-০)। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে (ইঞ্জুরি টাইম) পেনাল্টি থেকে গোল করে নেইমার জুনিয়র ব্যবধান ২-১ করলেও তা কেবল সান্ত্বনাই এনে দিয়েছে, ব্রাজিলের হার এড়াতে পারেনি। রেকার্ড ভাঙা এই জয়ে ফুটবল বিশ্বে এক নতুন রূপকথার জন্ম দিল নরওয়ে।
ম্যাচ টাইমলাইন ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি
নিচে ব্রাজিল বনাম নরওয়ের ঐতিহাসিক ম্যাচের মূল ঘটনাবলির একটি পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| সময় (মিনিট) | দলের নাম | ঘটনার বিবরণ |
| ৪’ | নরওয়ে | প্যাটট্রিক বার্গের গোল, তবে অফসাইডের কারণে বাতিল। |
| ১০’ | ব্রাজিল | ম্যাথিউস কুনহাকে ফাউল করায় ভিএআর (VAR) মারফত পেনাল্টি লাভ। |
| ১০’ | ব্রাজিল | ব্রুনো গুইমারেসের পেনাল্টি শট রুখে দিলেন নরওয়ের কিপার নাইল্যান্ড। |
| ৪৫+’ | ব্রাজিল | কুনহা ও মার্তিনেল্লির দূরপাল্লার শট নরওয়ে ডিফেন্স কর্তৃক প্রতিহত। |
| ৪৬’ | নরওয়ে | কৌশলগত পরিবর্তন; মাঠে নামলেন অস্কার বব ও আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ। |
| ৫৮’ | ব্রাজিল | কুনহার পরিবর্তে মাঠে প্রবেশ করলেন তরুণ স্ট্রাইকার এন্দ্রিক। |
| ৫৯’ | ব্রাজিল | ভিনিসিয়ুসের পাস থেকে এন্দ্রিকের নিশ্চিত গোলের সুযোগ মিস। |
| ৬২’ | ব্রাজিল | রায়ানের জোরালো শট অসাধারণ দক্ষতায় সেভ করলেন নাইল্যান্ড। |
| ৬৭’ | ব্রাজিল | জোড়া পরিবর্তন; মাঠে নামলেন নেইমার জুনিয়র ও দানিলো। |
| ৭৯’ | নরওয়ে | আর্লিং হালান্ডের দুর্দান্ত হেডে প্রথম গোল, নরওয়ে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে। |
| ৮৯’ | নরওয়ে | ডি-বক্সের বাইরে থেকে হালান্ডের বুলেট গতির শটে দ্বিতীয় গোল (২-০)। |
| ৯০+’ | ব্রাজিল | পেনাল্টি থেকে সান্ত্বনাসূচক গোল করলেন নেইমার জুনিয়র (২-১)। |
