টাইব্রেকারে জার্মানিকে বিদায় করে শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ে

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম বড় অঘটনটি দেখেই ফেলল ক্রীড়াবিশ্ব। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ে। রাউন্ড অব থার্টি টু বা শেষ বত্রিশের এই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে হেরে নকআউট পর্বের শুরুতেই ঘরের পথ ধরতে হচ্ছে জার্মানদের।

বোস্টন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ গোলে সমতায় শেষ হয়। এরপর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও কোনো দল গোল করতে না পারায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানেও নাটকের শেষ ছিল না। প্রথম পাঁচটি করে শটে দুই দলই ৩-৩ সমতায় থাকার পর ম্যাচ গড়ায় সাডেন ডেথে। সাডেন ডেথে জার্মানির ডিফেন্ডার জনাথন টাহ বল গোলবারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারেন। তবে প্যারাগুয়ের হোসে কানালে কোনো ভুল করেননি, নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে দলকে পৌঁছে দেন শেষ ষোলোর মঞ্চে।

ভেঙে গেল জার্মানির অপরাজেয় রেকর্ড

দীর্ঘ ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেছে প্যারাগুয়ে। আর ফিরেই তারা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় এক কীর্তি গড়েছে। বিশ্বকাপে এর আগে জার্মানি কখনো টাইব্রেকারে হারেনি। আগের চারবারের টাইব্রেকার লড়াইয়ের প্রতিটিতেই জিতেছিল তারা। পেনাল্টি শুটআউটে জার্মানির সেই অপরাজেয় ঐতিহ্যে এবার বড় ধাক্কা দিল প্যারাগুয়ে।

লাতিন আমেরিকার এই দলটির জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তাদের গোলকিপার অরলান্দো হিলের। পুরো ম্যাচজুড়ে তো বটেই, টাইব্রেকারেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ম্যাচের নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে মোট ৬টি দুর্দান্ত সেভ করেন তিনি। এরপর টাইব্রেকারে জার্মানির দুটি শট ঠেকিয়ে দিয়ে দলের জয়ের নায়ক বনে যান এই গোলরক্ষক।

মাঠের লড়াই ও নাটকীয়তা

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে ছিল জার্মানি। তবে প্রথমার্ধে আক্রমণভাগের ধার কম থাকায় তারা গোলমুখ খুলতে পারছিল না। উল্টো ৪২তম মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে দুর্দান্ত এক গোলে প্যারাগুয়েকে এগিয়ে নেন হুলিও এনসিসো। ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে যায় জার্মানি।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই অবশ্য ঘুরে দাঁড়ায় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ৫৪তম মিনিটে চমৎকার এক হেডে জার্মানিকে ১-১ সমতায় ফেরান ফরোয়ার্ড কাই হাভার্টজ। সমতা ফেরার পর জার্মানি আক্রমণের গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে প্যারাগুয়ে তখন অল-আউট রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নেয়। ফ্লোরিয়ান ভির্টৎজ ও লিরয় সানেদের একের পর এক আক্রমণ প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগে এসে বাধা পাচ্ছিল।

ম্যাচের সবচেয়ে বড় নাটকটি মঞ্চস্থ হয় অতিরিক্ত সময়ে। জার্মানির জনাথন টাহ হেডে বল প্যারাগুয়ের জালে পাঠিয়ে উল্লাসে মেতে উঠেছিলেন। তবে সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। রেফারির বাঁশিতে গোলটি বাতিল হয়ে যায়, কারণ হেডের ঠিক আগের মুহূর্তে জার্মানির ভালডেমার আন্টন প্যারাগুয়ের গোলকিপারকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল হওয়ায় ম্যাচ শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে গড়ায়।

টাইব্রেকার ও সাডেন ডেথের রোমাঞ্চ

কখনো টাইব্রেকারে না হারার আত্মবিশ্বাস নিয়েই হয়তো পেনাল্টি শুটআউট শুরু করেছিল জার্মানি। কিন্তু প্রথম শট নিতে এসেই খেই হারিয়ে ফেলেন কাই হাভার্টজ। তাঁর নেওয়া শটটি বাম দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রুখে দেন প্যারাগুয়ের গোলকিপার হিল। এরপর জশুয়া কিমিখ ও জামাল মুসিয়ালা গোল করলেও জার্মানির চতুর্থ শট নিতে আসা ভোল্টেমাডের শটটি আবারও আটকে দেন হিল।

টাইব্রেকারের টার্নিং পয়েন্ট: প্যারাগুয়ে তাদের প্রথম তিন শটে গোল করলেও চতুর্থ শটটি মিস করে এবং পঞ্চম শটটি রুখে দেন জার্মান গোলকিপার মানুয়েল নয়ার। ফলে স্কোরলাইন ৩-৩ সমতায় চলে আসে। কিন্তু সাডেন ডেথে হোসে কানালের শট নয়ার আর আটকাতে পারেননি। অন্যদিকে জনাথন টাহ মিস করায় জার্মানির বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায়।

২০১৪ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি গত দুই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। এবার গ্রুপ পর্ব পার হলেও প্রথম নকআউট ম্যাচেই তাদের বিদায় নিতে হলো। অন্যদিকে, ২০১০ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা প্যারাগুয়ে আরও একবার বড় স্বপ্নের দিকে এগিয়ে গেল। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে তারা মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও সুইডেনের মধ্যকার বিজয়ী দলের।

মন্তব্য করুন