বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে এক চরম রোমাঞ্চকর ও জাদুকরী প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েও এশিয়ার পরাশক্তি জাপানের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে শেষ মুহূর্তের এক অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে নিয়েছে সেলেসাওরা। প্রথমার্ধের একটি গোল হজম করে প্রায় এক ঘণ্টা পিছিয়ে ছিল লাতিন আমেরিকার এই দল। ম্যাচের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত যখন মনে হচ্ছিল খেলা নিশ্চিতভাবেই অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই লড়াকু ব্রাজিলকে উল্লাসে ভাসান গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। ইনজুরি সময়ের একেবারে শেষ মিনিটে, অর্থাৎ ৯৬তম মিনিটে তার করা চমৎকার গোলে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে ব্রাজিল।
টেক্সাসের হিউস্টনে অনুষ্ঠিত এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল পুরোপুরি ছিল ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের পায়ে। ম্যাচের মাত্র ৩ মিনিটেই প্রথম পরিষ্কার আক্রমণের সুযোগটি পায় তারা। বক্সের প্রান্ত থেকে ব্রুনো গিমারায়েসের নেওয়া একটি জোরালো শট জাপানি ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে গোলবারের সামান্য পাশ দিয়ে মাঠের বাইরে চলে যায়। এর ঠিক দুই মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে ওপর দিয়ে ডিফেন্স চেরা এক বল বাড়ায় ব্রাজিল। তবে গতিশীল ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সামনে বল পড়ার আগেই জাপানি গোলকিপার জিওন সুজুকি দারুণ দক্ষতায় সামনে এগিয়ে আসেন এবং শূন্যে লাফিয়ে দুই হাত দিয়ে পাঞ্চ করে বল ক্লিয়ার করেন। শুরুর এই প্রাথমিক চাপ সামলে জাপান নিজেদের সুসংগঠিত রক্ষণভাগের ওপর ভর করে দারুণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
কাইশু সানোর চমক ও জাপানের প্রথমার্ধের লিড
ম্যাচের প্রথম ২৫ মিনিট পানি পানের বিরতি বা হাইড্রেশন ব্রেকের আগে ব্রাজিল প্রায় ৭৫ শতাংশ বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ৪টি আক্রমণ চালালেও কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায়নি। উল্টো বিরতির ঠিক পরপরই ম্যাচের ২৯ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে দেয় ব্লু সামুরাইরা। মাঝমাঠে ব্রাজিলের অধিনায়ক দানিলোর কাছ থেকে লুজ বল কেড়ে নেন জাপানের কাইশু সানো। তিনি গতিতে অভিজ্ঞ কাসেমিরোকে পরাস্ত করে তীব্র গতিতে ডি-বক্সের দিকে এগিয়ে যান। এরপর বক্সের ঠিক বাইরে থেকে ডান পায়ের এক নিখুঁত কোণাকুণি শটে ব্রাজিলের গোলকিপারকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান। জাপানের জার্সি গায়ে এটি সানোর প্রথম আন্তর্জাতিক গোল। এই গোলের ওপর ভর করে প্রথমার্ধে ১-০ ব্যবধানে লিড নিয়ে মাঠ ছাড়ে জাপান।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে ব্রাজিল গোল শোধে মরিয়া হয়ে উঠলেও জাপানি গোলরক্ষক সুজুকি একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করেন। ৩৯ মিনিটে মাথেউস কুনহার দূরপাল্লার শট এবং ভিনিসিয়ুসের আক্রমণ দারুণ দক্ষতায় রুখে দেন তিনি। উল্টো ৪৪ মিনিটে জাপানের রিতসু দোয়ান ও জুনিয়া ইতোর আক্রমণ সামলাতে বেশ বেগ পেতে হয় ব্রাজিলের ডিফেন্ডারদের।
দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের কৌশল বদল ও কাসেমিরোর সমতা
১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে ডাগআউটে কৌশল বদল করেন ব্রাজিলের কোচ। লুকাস পাকেতার পরিবর্তে মাঠে নামানো হয় তরুণ তুর্কি এন্দ্রিককে। এই পরিবর্তনের পর ব্রাজিলের আক্রমণে ধার আরও বাড়ে। ৫০ মিনিটে এন্দ্রিক তার রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ ভিনিসিয়ুসকে লক্ষ্য করে বল বাড়ালেও তা সুজুকি গ্লাভসবন্দি করেন। ৫২ মিনিটে দানিলোর ক্রস থেকে গিমারায়েসের জোরালো হেড ডাইভ দিয়ে বাঁচান কিউই কিপার। ৫৫ মিনিটে কাসেমিরোর হেড গোললাইনের ওপর থেকে প্রতিহত করেন জাপানি ডিফেন্ডার তাকেহিরো তোমিয়াসু।
তবে সেই ধাক্কা সামলে ঠিক পরের মিনিটেই, অর্থাৎ ৫৬ মিনিটে কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে দারুণ এক হেডে গোল করে ব্রাজিলকে ১-০ সমতায় ফেরান কাসেমিরো। সমতা ফেরার পর ব্রাজিলের আক্রমণ আরও তীব্র হয়। কাসেমিরোর গোলের তিন মিনিট পরেই ভিনিসিয়ুস বামপ্রান্ত থেকে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দারুণ গতিতে তোমিয়াসুকে নাটমেগ করে bক্সে ঢোকেন এবং সুজুকিকে ফাঁকি দিয়ে শট নেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বলটি পোস্টে লেগে ফিরে আসলে সে যাত্রা বেঁচে যায় জাপান।
শেষ মিনিটের মার্তিনেল্লি ম্যাজিক
ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে দুই দলই বেশ কিছু পরিবর্তন এনে জয়সূচক গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ৭৫ মিনিটে এন্দ্রিকের পাস থেকে ভিনিসিয়ুস বক্সে ঢুকলেও জাপানের ডিফেন্ডাররা তা ক্লিয়ার করেন। ৮৯ মিনিটে ভিনিসিয়ুসের আরও একটি শট ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে কর্নার হলে জাপানের রক্ষণভাগ তা প্রতিহত করে।
ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে রেফারি ৬ মিনিটের ইনজুরি সময় উপহার দেন। যখন ঘড়ির কাঁটায় ইনজুরি সময়ের শেষ মিনিট চলছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়া সেই ভুলটি করে বসে জাপান। ৮৯ মিনিটে মাঠে নামা জাপানি মিডফিল্ডার আও তানাকা বক্সের ঠিক বাইরে বিপজ্জনক জায়গায় বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসেন। সেখান থেকে বল কেড়ে নিয়ে ব্রুনো গিমারায়েস চতুরতার সাথে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির উদ্দেশ্যে একটি নিখুঁত থ্রু পাস বাড়ান। চোখের পলকে বলটি নিজের বাম পা থেকে ডান পায়ে নিয়ন্ত্রণে নেন মার্তিনেল্লি এবং জাপানি গোলকিপার সুজুকিকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান। ৯৬তম মিনিটের এই অবিশ্বাস্য গোলে ২-১ ব্যবধানের নাটকীয় জয় নিশ্চিত করে পরের রাউন্ড তথা শেষ ১৬-এর মঞ্চে পা রাখল সেলেসাওরা।
