বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর তথা বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ না পেলেও, এ দেশে ফুটবল নিয়ে উন্মাদনার কোনো কমতি নেই। প্রতি চার বছর পর পর যখন বিশ্বকাপ ফুটবল ফিরে আসে, তখন এই আবেগ ও পাগলামি আরও বহুগুণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে ঘিরে পুরো বাংলাদেশ যেন আক্ষরিক অর্থেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
ইউরোপের দল যেমন স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড কিংবা ইতালির কিছু সমর্থক এ দেশে থাকলেও সিংহভাগ ফুটবলপ্রেমীই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের অন্ধ ভক্ত। বিশ্বকাপের মরসুমে প্রিয় দলের পতাকায় ছেয়ে যায় পুরো দেশের আকাশ, জার্সি গায়ে রাজপথে বের হয় বিশাল সব বিজয় মিছিল। ম্যাচের দিনগুলোতে পাড়ায় পাড়ায় বড় পর্দায় প্রজেক্টরের মাধ্যমে একসঙ্গে খেলা দেখার ধুম পড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে বাংলাদেশি দর্শকদের এই অবিশ্বাস্য পাগলামির খবর এখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এবার বাংলাদেশি সেলেসাও ভক্তদের সেই বাঁধভাঙা উল্লাসের চিত্র বিশদভাবে তুলে ধরেছে ব্রাজিলের অন্যতম শীর্ষ ও জনপ্রিয় ক্রীড়া গণমাধ্যম ‘গ্লোবো ইস্পোর্তে’।
গ্লোবোর প্রতিবেদনে উঠে এলো ঢাকার রাজপথ
ব্রাজিলিয়ান এই সংবাদমাধ্যমটি ‘সবুজ-হলুদে বাংলাদেশ: এশীয়দের ব্রাজিলকে ভালোবাসার কারণ জেনে নিন’ শিরোনামে একটি বিশেষ সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে এ দেশের মানুষের ব্রাজিল ফুটবল দলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার গভীরতা ও বৈচিত্র্যময় উদযাপনের খবর ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
গ্লোবোর প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় অসংখ্য ফুটবলপ্রেমী মানুষ বড় স্ক্রিনে ম্যাচ উপভোগ করছেন। কার্লো আনচেলত্তির দল যখনই মাঠে নামছে, তাদের প্রতিটি আক্রমণ আর গোলের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের নগরীতে পরিণত হচ্ছে চারপাশ।”
কেন এই লাতিন ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা?
দূর এশিয়ার একটি দেশে হাজার হাজার মাইল দূরের লাতিন ফুটবলের এমন রাজত্ব গড়ে ওঠার পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণও খুঁজে বের করেছে গ্লোবো। তাদের প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বা বৈশ্বিক মঞ্চে তেমন কোনো বড় সাফল্য পায়নি। দীর্ঘদিন ধরে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে দলটির অবস্থান ১৮০-এর আশেপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
জাতীয় দলের বড় কোনো বৈশ্বিক সাফল্য না থাকায়, দেশের ফুটবলপ্রেমের মূল জায়গাটি দখল করে নিয়েছে লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা। ফলে বাংলাদেশে ফুটবল মানেই এক অদ্ভুত দ্বিমুখী আবেগ। তবে গ্লোবোর প্রতিবেদনে একটি বিশেষ দাবি করা হয়েছে। তাদের মতে, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার চেয়ে ব্রাজিলের সমর্থক সংখ্যায় কিছুটা বেশি। এই দাবির পক্ষে তারা ঢাকার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলের উন্মাদনা ও বর্ণিল সাজসজ্জার উদাহরণ টেনে এনেছে।
বাংলাদেশি ভক্তদের ধন্যবাদ জানালেন আলিসন ও কাসেমিরো
বাংলাদেশের এই ফুটবল জোয়ারের খবর শুধু গণমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নেই, খোদ ব্রাজিল জাতীয় দলের ফুটবলারদের কাছেও পৌঁছে গেছে। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচের পর স্টেডিয়ামের মিক্সড জোনে যখন ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়রা গণমাধ্যমের মুখোমুখি হচ্ছিলেন, তখন বাংলাদেশের নাম শুনেই তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
সেলেসাওদের প্রধান গোলরক্ষক আলিসন বেকার দারুণ এক হাসিতে বলেন, “ওহ দারুণ! ধন্যবাদ বাংলাদেশ। আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোমাদের উন্মাদনার ভিডিওগুলো দেখেছি। সত্যিই অসাধারণ সেই দৃশ্য! আমাদের এভাবে ভালোবাসার ও সমর্থন করার জন্য তোমাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ।” একই সময়ে রিয়াল মাদ্রিদ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক তারকা মিডফিল্ডার কাসেমিরো বাংলাদেশের ভক্তদের উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “ধন্যবাদ বাংলাদেশ। দূর থেকে ব্রাজিল দলকে এভাবে অকুণ্ঠ সমর্থন জুগিয়ে যাওয়ার জন্য আপনাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।” বিশ্বসেরা তারকাদের মুখে দূর দেশের ভক্তদের এমন স্বীকৃতি বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমীদের আবেগকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
