রায়পুরের নাটকীয় ক্রিকেটরাত্রি: ৩৫৯ তাড়া করে দক্ষিণ আফ্রিকার বিস্ময়

রায়পুরের ঝাঁ-চকচকে নতুন স্টেডিয়ামে যখন ভারতের স্কোরবোর্ডে ভেসে উঠল ৩৫৮/৫, তখন বেশির ভাগ দর্শকই ধরে নিয়েছিলেন ম্যাচের ফল প্রায় নিশ্চিত। কোহলি যখন সেঞ্চুরি তুলে ব্যাট তুলে ধরছেন আর রুতুরাজ যখন তার প্রথম আন্তর্জাতিক ওয়ানডে শতক উদ্‌যাপন করছেন, তখন ভারতের ডাগআউটে যেন পরের সকালে সিরিজ জয়ের উৎসব পরিকল্পনাও শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ক্রিকেটকে বলা হয় ‘বিচিত্র খেলার রাজা’—এটির অনিশ্চয়তাই তাকে বারবার নতুন গল্প শোনায়। আর আজকের গল্পটি লেখার নায়ক ছিলেন এইডেন মার্করাম, ব্রিটজকে এবং বিস্ফোরক ডেভাল্ড ব্রেভিস।

দক্ষিণ আফ্রিকার চেজটি শুরু হয়েছিল নিখুঁত মনোযোগ নিয়ে। মার্করাম ক্রিজে নেমেই বুঝিয়ে দেন তিনি শুধু টিকে থাকার জন্য মাঠে আসেননি—তিনি এসেছেন বড় ইনিংস খেলার দায়িত্ব নিয়ে। তার প্রতিটি শট ছিল মেপে খেলা, সুনিপুণ, কখনো সময় নিয়ে, কখনো আক্রমণে। ভারতের পেস বোলাররা যখন ব্যাক অফ লেংথে ভরসা করছিলেন, তখন মার্করাম লাইন-লেন্থের ভুল খুঁজে বের করে বাউন্ডারি তুলছিলেন। তার ৯৮ বলের ১১০ রানের ইনিংসটি মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার পরবর্তী প্রতিটি জুটির ভিত্তি।

তার অপর পাশে ছিলেন টেম্বা বাভুমা, যিনি নেতা হিসেবেও আজ শান্ত-স্থির ছিলেন। তার ৪৮ বলে ৪৬ রানের ইনিংসটি হয়তো পরিসংখ্যানে খুব জ্বলজ্বলে নয়, কিন্তু ম্যাচের মোমেন্টাম ধরে রাখতে তার অবদান ছিল অমূল্য। এই দুই ব্যাটার যখন ১০১ রানের জুটি গড়ছিলেন, তখন ভারতের স্পিন বিভাগ প্রায় অসহায় দেখাচ্ছিল। মার্করামের স্কিল, বাভুমার দৃঢ়তা—একই সঙ্গে তারা প্রতিটি ওভারে হিসাব মিলিয়ে রান তুলছিলেন।

ম্যাথু ব্রিটজকের প্রবেশটা আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তরুণ এই ব্যাটার কেবল স্ট্রাইক ঘুরিয়েই যাননি, বরং সুযোগ পেলেই বাউন্ডারি মেরেছেন। ভারতীয় পেসারদের বিপক্ষে তার কভার ড্রাইভ আর পুল শট মুহূর্তেই দর্শকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। তারপর আসে ব্রেভিস—যাকে সবাই ‘বেবি এবিডি’ বলে চেনে। তার ইনিংসটা ছিল একদম টি–টোয়েন্টির ধাঁচে। মাত্র ৩৪ বলের ইনিংসে ৫৪ রান, কয়েকটি বিশাল ছক্কা—ম্যাচে ভারতীয় সমর্থকদের কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধ করে দেয়।

এই দুজন যখন ৯২ রানের জুটি গড়লেন, তখন ভারতের প্রতিটি বোলারই একপ্রকার দিশেহারা। শেষ দশ ওভারে ম্যাচের রং একেবারে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে চলে যায়। তবুও ব্রিটজকের উইকেট এবং ডি জর্জির চোট একটা চাপ তৈরি করেছিল। ভারত আবার লড়াইয়ে ফিরবে—এমন আশা তখনও ছিল। কিন্তু করবিন বশ এসে সেটি আর হতে দিলেন না। ১৫ বলে ২৯ রানের তার তাণ্ডব দক্ষিণ আফ্রিকাকে ম্যাচ জিতিয়ে দিয়ে মাঠকে স্তব্ধ করে দেয়।

অথচ দিনের শুরুতে ভারতের ব্যাটিং ছিল যথেষ্ট উজ্জ্বল। রোহিত ও যশস্বী ব্যর্থ হলেও কোহলি আবারো দেখালেন কেন তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা। তার প্রতিটি শট ছিল চোখ জুড়ানো—৭ চার, ২ ছক্কা, সব মিলিয়ে পরিপাটি ১০২ রান। রুতুরাজের আগ্রাসী ১০৫ রান তাকে দারুণ সঙ্গ দেয়। এই দুইজনের ১৯৫ রানের জুটি ছাড়া ভারতের স্কোর তিনশো পার হওয়াই কঠিন হতো।

কিন্তু ক্রিকেটে বড় স্কোর কখনোই নিরাপদ নয়—যদি প্রতিপক্ষ বুঝে খেলে। দক্ষিণ আফ্রিকা সেটিই করেছে। তাদের ব্যাটসম্যানরা প্রতিটি ওভার অনুযায়ী পরিকল্পনা বদলেছে, প্রতিটি বোলারের দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে এবং মানসিকভাবে আক্রমণাত্মক থেকেছে।

শেষ পর্যন্ত রায়পুরের রাতটা হয়ে উঠল দক্ষিণ আফ্রিকার। ভারত পেল কোহলির সেঞ্চুরির আনন্দ, কিন্তু ম্যাচটি নিয়ে গেল প্রোটিয়া ব্যাটারদের নির্বিঘ্ন শৈলী।

Leave a Comment